মৌলভীবাজারের বাঁশ ফার্নিচারে বিদেশি চাহিদা

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

কাঠ কিংবা বেতের প্রচলিত আসবাবের ভিড়ে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নিচ্ছে বাঁশের ফার্নিচার। পরিবেশবান্ধব, নান্দনিক ও তুলনামূলক কম দামের কারণে মৌলভীবাজারের তৈরি এই বাঁশের আসবাব এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও। কুটিরশিল্প হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সাথে এটি এখন সম্ভাবনাময় এক শিল্পখাতে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামে গেলে চোখে পড়ে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। এখানে কাঠের বদলে বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ডিজাইনের সোফাসেট, খাট, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার থেকে শুরু করে ঘরের শৌখিন সাজসজ্জার নানা উপকরণ। গ্রামের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন উদ্যোক্তা আমির হোসেন সিরাজ, যিনি প্রায় দুই দশক আগে অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন তার যাত্রা।

শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। সীমিত পুঁজি, কম চাহিদা এবং বাজার সম্পর্কে অজ্ঞতা—সব মিলিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে তাকে। তবে ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং সময়োপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন একটি সুসংগঠিত কারখানা। বর্তমানে তার তৈরি বাঁশের ফার্নিচার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা বাড়ছে।

স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বাঁশই এই শিল্পের মূল কাঁচামাল। তবে শুধু বাঁশ কাটলেই কাজ শেষ নয়, বরং সেটিকে ব্যবহার উপযোগী করতে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথমে বাঁশকে ভালোভাবে শুকানো হয়, এরপর পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে বিশেষ রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ার পরই শুরু হয় কারিগরদের দক্ষ হাতে নকশা অনুযায়ী আসবাব তৈরির কাজ। একটি বড় ফার্নিচার তৈরি করতে প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে, আর ছোট আকারের পণ্যগুলো তুলনামূলক দ্রুত তৈরি হয়।

এই কারখানায় কর্মরত কারিগররা জানান, সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়েই তারা নতুন নতুন ডিজাইন তৈরি করছেন। আধুনিক ঘর সাজানোর জন্য এখন অনেকেই কাঠের পরিবর্তে বাঁশের আসবাব বেছে নিচ্ছেন। এতে যেমন খরচ কম, তেমনি পরিবেশের ওপর চাপও কম পড়ে। বিশেষ করে ছোট আকারের পণ্য যেমন টেবিল ল্যাম্প, ফুলের টব বা পেন স্ট্যান্ড—এসবের চাহিদা অনেক বেশি।

মৌলভীবাজার পর্যটননির্ভর একটি জেলা হওয়ায় এখানকার বাঁশের ফার্নিচারের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। ২০১৫ সালে জেলাটিকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেলগুলো তাদের সাজসজ্জায় বাঁশের আসবাব ব্যবহার শুরু করে। এতে করে পর্যটকদের কাছে এটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। বিদেশি পর্যটকরাও এখান থেকে ছোট ছোট পণ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যান, যা এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এই উদ্যোগ শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি পুরো এলাকার অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেকেই এই কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে। স্থানীয় লিয়াকত আলী বলেন, সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও বড় পরিসরে গড়ে উঠতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

ক্রেতাদের মধ্যেও এই ফার্নিচার নিয়ে রয়েছে সন্তুষ্টি। সাফওয়ান আহমেদ নামের এক ক্রেতা জানান, তিনি তার সন্তানের পড়াশোনার জন্য একটি বাঁশের টেবিল ও চেয়ার কিনেছেন। তার মতে, এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি টেকসই এবং দামের দিক থেকেও সাশ্রয়ী। তিনি মনে করেন, কাঠের আসবাবের তুলনায় বাঁশের ফার্নিচার এখন অনেক ক্ষেত্রেই ভালো বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

উদ্যোক্তা আমির হোসেন সিরাজ জানান, শুরুতে শখের বসে এই কাজ শুরু করলেও এখন এটি তার জীবনের প্রধান পেশা হয়ে উঠেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া বিদেশেও কিছু ক্রেতা নিয়মিত অর্ডার দেন। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মান উন্নয়নের মাধ্যমে বাঁশের ফার্নিচারকে আরও টেকসই করা সম্ভব হয়েছে। বিদেশ থেকে আনা বিশেষ তেলজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করায় পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ে।

তবে এই শিল্পের বিকাশে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে আসতে পারছেন না। এ বিষয়ে মৌলভীবাজার শিল্প নগরী কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই শেষে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে, যা এই শিল্পের প্রসারে সহায়ক হতে পারে।

সবকিছু বিবেচনায় মৌলভীবাজারের বাঁশের ফার্নিচার শিল্প এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ছে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগের সমন্বয়ে এই কুটিরশিল্প একদিন বৃহৎ শিল্পে পরিণত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ফাহিমা হত্যার বিচার ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে: ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলং ভ্রমণেই শেষ যাত্রা, নদীতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কালনী নদী এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশ ভালো নেই’—সিলেটে ডা. শফিকুরের মন্তব্য

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জাফলং ভ্রমণেই শেষ যাত্রা, নদীতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কতা

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কালনী নদী এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশ ভালো নেই’—সিলেটে ডা. শফিকুরের মন্তব্য

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছাতক বড় কাপন পয়েন্টে সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১৫

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট রেলস্টেশন এলাকায় শিশুধর্ষণের অভিযোগ, আটক ১

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ