প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে আরও আধুনিক, বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক মানের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সরকার বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি নতুন এয়ারক্রাফট ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
রোববার রাতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হজ্জ ফ্লাইট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার শুধু বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায় না, বরং এটিকে এমন একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় এয়ারলাইন্স হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যা বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করবে গর্বের সঙ্গে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাহিদা মোকাবিলায় বিমানের বহর সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই লক্ষ্য থেকেই বোয়িং থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতের পরিবর্তন, নতুন গন্তব্য সংযোজন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াতের বিষয় বিবেচনায় আরও কয়েকটি উড়োজাহাজ সংযোজনের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, হজ্জ ও ওমরাহ যাত্রী এবং প্রবাসীদের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। সরকার সেই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হজ্জযাত্রীদের মধ্যে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পবিত্র হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাত্রা করতে পেরে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে ভিড় করেন স্বজনরা। অনেকের চোখে ছিল আনন্দ আর বিচ্ছেদের মিশ্র অনুভূতি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, রোববার রাত ১০টায় সিলেট থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে প্রথম হজ্জ ফ্লাইট ছেড়ে যাবে। চলতি হজ্জ মৌসুমে সিলেট থেকে মোট সাতটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। প্রতিটি ফ্লাইটে প্রায় ৪১৯ জন করে যাত্রী সৌদি আরব যাবেন। এর মধ্যে একটি ফ্লাইট সরাসরি মদিনায় অবতরণ করবে এবং বাকি ছয়টি ফ্লাইট জেদ্দা বিমানবন্দরে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবছর সিলেট অঞ্চল থেকে মোট ৩ হাজার ৩৯৪ জন হজ্জযাত্রী সৌদি আরব যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রী সরাসরি সিলেট থেকে সাতটি ফ্লাইটে সৌদি আরব যাবেন। বাকি ৪৬১ জন ঢাকার বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা সম্পন্ন করায় ঢাকা হয়ে সৌদি আরবে যাবেন।
বিমানবন্দর ও বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হজ্জযাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের ইমিগ্রেশন, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত জনবল নিয়োজিত রয়েছে। হজ্জযাত্রীদের সহায়তায় বিমানবন্দরে আলাদা বুথও স্থাপন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ। এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, সিলেট অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ও হজ্জযাত্রী বিদেশে যাতায়াত করেন। তাই সিলেট বিমানবন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা এবং কার্গো সুবিধা সম্প্রসারণের দাবি দীর্ঘদিনের। তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকারের নতুন পরিকল্পনার ফলে সিলেট বিমানবন্দর আরও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ শুধু যাত্রীসেবা উন্নয়নের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে তারা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র নতুন এয়ারক্রাফট কেনাই যথেষ্ট নয়। সময়ানুবর্তিতা, যাত্রীসেবার মান, টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ বিশ্বমানের এয়ারলাইন্স হিসেবে পরিচিতি পেতে হলে শুধু বহর নয়, সেবার মানেও পরিবর্তন আনতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বহরে যুক্ত হয়েছে ড্রিমলাইনারসহ আধুনিক কিছু উড়োজাহাজ। নতুন করে ১৪টি এয়ারক্রাফট যুক্ত হলে বিমানের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হজ্জ ফ্লাইট উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সিলেটের আকাশে যে নতুন ব্যস্ততা শুরু হয়েছে, তার মধ্যেই সরকারের এই বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা দেশের বিমান পরিবহন খাতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা—জাতীয় এয়ারলাইন্স হিসেবে বিমান সত্যিই যেন দেশের মর্যাদা ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।


