প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের রেলস্টেশন এলাকায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মঙ্গলবার ভোররাতে সংঘটিত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দা, রেলওয়ে পুলিশ এবং দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে স্টেশন এলাকায় অবস্থান করতেন এবং মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর রাত ৪টার দিকে সিলেট রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ভবনে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত লোদন (৩৫) নামের ওই ব্যক্তি রাতের কোনো একসময় শিশুটিকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন ও বিভ্রান্তির মাধ্যমে সঙ্গে নিয়ে যান। পরে তাকে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত স্থানে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় স্টেশন এলাকায় পড়ে থাকতেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কিছু মানুষ লক্ষ্য করলেও অভিযুক্তের হাতে ধারালো অস্ত্রসদৃশ কিছু থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে সাহস পাননি। পরিস্থিতির অবনতি বুঝতে পেরে স্থানীয়রা দ্রুত রেলওয়ে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন।
খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধার করে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও আটক করা হয়। পরে বিষয়টি দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশকে জানানো হলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং অভিযুক্তকে তাদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া শিশুটি ভবঘুরে প্রকৃতির এবং স্টেশন এলাকাতেই বেশিরভাগ সময় অবস্থান করত। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তারা সবাই মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে স্টেশন এলাকায় রাতযাপন করে আসছিল। শিশুটির অভিযোগের ভিত্তিতে এবং রেলওয়ে পুলিশের সহায়তায় একজনকে আটক করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, পথশিশু, ভবঘুরে শিশু এবং পরিবারবিচ্ছিন্ন কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয় ও নিয়মিত নজরদারির অভাবে এসব শিশু সহজেই অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়। বিশেষ করে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল নগর এলাকার আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি সমাজের মানবিক ও নৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশুদের জন্য পুনর্বাসন, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা জোরদার না করলে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।
এদিকে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অনেকেই স্টেশন এলাকায় ভবঘুরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত চলছে। শিশুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, শিশু ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ভুক্তভোগী শিশুর সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে তারা বদ্ধপরিকর।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় শুধু বিচার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং ভুক্তভোগী শিশুর শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সিলেটের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। শিশুদের প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।


