প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গল আবারও নতুন করে মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের। চা-বাগান, টিলা আর সবুজের অপরূপ মেলবন্ধনের এই জনপদে এবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিরল প্রজাতির নাগলিঙ্গম গাছ। এর অদ্ভুত গঠন, মনোমুগ্ধকর রঙ এবং তীব্র সুগন্ধ যেন প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পভাষ্য, যা দেখলে যে কেউ থমকে দাঁড়াতে বাধ্য।
প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মা তার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ গ্রন্থে নাগলিঙ্গমের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, এই ফুলের রঙ, গন্ধ ও বিন্যাস মানুষকে অবধারিতভাবে মুগ্ধ করে। তার সেই পর্যবেক্ষণ যেন আজও সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতিতে। এই গাছের সামনে দাঁড়ালে সত্যিই মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে তার শিল্পকর্ম সাজিয়ে রেখেছে মানুষের চোখের জন্য।
নাগলিঙ্গম গাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ফুল ফোটার ধরন। সাধারণত গাছের ডালপালায় ফুল ফোটে, কিন্তু এই গাছের ফুল ফুটে সরাসরি কাণ্ডজুড়ে। যেন গাছের বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে রঙিন ফুলের সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ অত্যন্ত যত্ন করে গাছের গায়ে ফুল গেঁথে দিয়েছে। এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণেই নাগলিঙ্গম অন্য সব গাছ থেকে আলাদা এবং দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে বর্তমানে দুটি স্থানে এই বিরল গাছের দেখা মিলছে। একটি রয়েছে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে, অন্যটি মির্জাপুর ইউনিয়নের শহরশ্রী গ্রামের একটি ব্যক্তিগত বাড়ির আঙিনায়। দুই স্থানেই এখন নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ও ফলের সমারোহ, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষজন।
বিশেষ করে বিটিআরআই ক্যাম্পাসের গাছটি এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। জানা যায়, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন এখানে এই গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকের পরিচর্যায় গাছটি আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একইভাবে শহরশ্রী গ্রামের গাছটিও প্রায় ছয় দশকের পুরোনো, যার প্রতিটি অংশে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপকথা।
এই গাছের ফুলের গঠনও বেশ অদ্ভুত ও আকর্ষণীয়। ছয় পাপড়ির ফুলগুলোতে গাঢ় গোলাপি ও হালকা হলুদ রঙের মিশ্রণ থাকে। অনেকেই বলেন, ফুলটি দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো, আর এই বৈশিষ্ট্য থেকেই এসেছে ‘নাগলিঙ্গম’ নামটি। ফুলের তীব্র সুগন্ধ দূর থেকেই অনুভব করা যায়, যা দর্শনার্থীদের আরও আকৃষ্ট করে তোলে।
স্কুলছাত্রী মেহজাবিন আক্তার জানায়, ফুলগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি কিছুটা ভীতিকরও মনে হয়। অন্যদিকে সিলেট থেকে আসা পর্যটক নুসরাত জাহান বলেন, এই ফুলের সুবাস এতটাই আলাদা যে একবার কাছে গেলে তা সহজে ভোলা যায় না। তার মতে, এটি যেন প্রকৃতির এক নীরব শিল্পকাব্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
নাগলিঙ্গম শুধু সৌন্দর্যের দিক থেকেই নয়, বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুণাগুণেও সমৃদ্ধ। গবেষকদের মতে, এই গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে তৈরি ওষুধ পেটের নানা রোগে ব্যবহার করা হয়। এর পাতা, ফুল, ফল ও বাকল সবই কোনো না কোনোভাবে উপকারী। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রায় ১১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এটি দ্রুতবর্ধনশীল হওয়ায় চারা লাগানোর ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যেই ফুল দেওয়া শুরু করে।
গাছটির পাতাও বেশ দৃষ্টিনন্দন। গাঢ় সবুজ রঙের গুচ্ছবদ্ধ পাতাগুলো সাধারণত ৮ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এসব পাতা ঝরে পড়ে, তখন গাছের কাণ্ড সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং ফুলগুলো আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিকভাবে এই গাছের সঙ্গে জমিদারি সংস্কৃতিরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার জমিদাররা তাদের বাড়িতে নাগলিঙ্গম গাছ লাগাতেন, কারণ এর ফল হাতির প্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও এখন সেই ঐতিহ্য আর নেই, তবে গাছটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখনও মানুষের আগ্রহ বাড়ায়।
বাপা (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল মনে করেন, শ্রীমঙ্গলের মতো এলাকায় এমন বিরল গাছ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই এর সম্পর্কে জানেন না। তার মতে, এই গাছগুলো শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
শহরশ্রী গ্রামের বাসিন্দা দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদ জানান, তাদের বাড়ির গাছটি প্রায় ৬০ বছর আগে রোপণ করা হয়েছিল। প্রথমদিকে তারা জানতেন না এটি কী গাছ, তবে ফুল ফুটতে শুরু করার পর এর পরিচয় জানা যায়। এখন এই গাছ তাদের বাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. ইসমাইল হোসেন জানান, নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্ট অঞ্চল। বাংলাদেশে এটি খুবই বিরল এবং প্রায় বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত। তিনি বলেন, এই গাছ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, কারণ এটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, গ্রীষ্মকাল নাগলিঙ্গম ফুল দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। যদিও সারা বছরই কিছু না কিছু ফুল ফোটে, তবে এই মৌসুমে এর সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়। দিন কিংবা রাত—যে সময়ই গাছটির কাছে যাওয়া হোক না কেন, এর সুবাস ও রূপ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবেই।
সব মিলিয়ে নাগলিঙ্গম এখন শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক আকর্ষণের নতুন সংযোজন। এটি শুধু একটি ফুল বা গাছ নয়, বরং প্রকৃতির নিঃশব্দ এক শিল্পকর্ম, যা মানুষের মনে বিস্ময় ও ভালোবাসা জাগায়। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা গেলে এই বিরল গাছ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও একইভাবে বিস্ময়ের উৎস হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা প্রকৃতিপ্রেমী ও সংশ্লিষ্টদের।


