প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “দেশ ভালো নেই। মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।” মঙ্গলবার সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। একইসঙ্গে তিনি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং আলোচিত শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
এর আগে তিনি সিলেটে নিহত শিশু ফাহিমা আক্তারের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি গভীর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম সম্পর্কে তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেও তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে এবং সেখানে তিনি বিস্তারিত মূল্যায়ন তুলে ধরবেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের আশা করেছিল, বাস্তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে না। তার মতে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
দেশের অর্থনীতি এবং জনজীবনে প্রভাব ফেলছে এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত বাড়তি চাপ বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই মানুষ দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো এলাকায় টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে বা সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যখাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হলে অনেক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।
তবে এদিনের আলোচনার সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যা প্রসঙ্গ। ফাহিমার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সামনে ডা. শফিকুর রহমান গভীর বেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন এভাবে নির্মমভাবে শেষ হয়ে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্য লজ্জার বিষয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় অপরাধীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হবে না এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। তার মতে, এমন আলোচিত ও স্পর্শকাতর মামলায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া উচিত।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, কোনো অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হয় না; অনেক ক্ষেত্রে সহযোগী, আশ্রয়দাতা বা তথ্য গোপনকারীরাও অপরাধকে উৎসাহিত করে। তাই প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এতে ভবিষ্যতে অপরাধীদের সহযোগিতা করার প্রবণতাও কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
শিশু ফাহিমার বাবা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকাকালে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ডা. শফিকুর রহমান। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসা অবস্থায় তিনি বলেন, একটি শিশুর হাসিমাখা মুখের ছবি দেখলে চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন। তার মতে, এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটে দেওয়া ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে একদিকে যেমন সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের সমালোচনা উঠে এসেছে, অন্যদিকে শিশু নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগও প্রতিফলিত হয়েছে। তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে সংসদের আসন্ন অধিবেশনে তিনি এসব বিষয়ে কী ধরনের অবস্থান তুলে ধরবেন তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ফাহিমা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার এবং শিশু নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে। মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু কঠোর আইন নয়, কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সব স্তরে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
সিলেটে এক দিনের সফরে ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক ও মানবিক নানা প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা এবং শিশু নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তিনি প্রকাশ করেছেন, তা আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


