প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা। সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, নদীশাসন, নগর উন্নয়ন কিংবা শিল্পাঞ্চল নির্মাণ—সবখানেই প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ পাথর ও অ্যাগ্রিগেট। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ উপকরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাথর আমদানি করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেটের নদী ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ শিলাসম্পদ, যা সঠিক পরিকল্পনায় কাজে লাগানো গেলে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেট অঞ্চলের ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া, ডাউকি নদী, জাফলং ও জয়ন্তিয়া এলাকার নদী ও পিডমন্ট অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বোল্ডার ও গ্র্যাভেল জমা রয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ভূতত্ত্ববিদ গবেষক মো. খাইরুল কবির আদিল এবং অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা। তাদের মতে, ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় নদীপথে নেমে আসা পাথর শত শত বছর ধরে সিলেট অঞ্চলে জমা হয়েছে। এই প্রাকৃতিক সঞ্চয় এখন দেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণায় প্রাথমিকভাবে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভোলাগঞ্জ, রাংপানি ছড়া ও ডাউকি নদী এলাকায় প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ মিটার গভীরতায় জমে থাকা গ্র্যাভেল ও বোল্ডারের পরিমাণ প্রায় ৬৫ লাখ ঘনমিটার। দৃশ্যমান বড় বোল্ডারের মধ্যে শুধু ভোলাগঞ্জেই রয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৬০ ঘনমিটার পাথর। রাংপানি ছড়ায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯১ ঘনমিটার এবং ডাউকি নদীতে রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৮২১ ঘনমিটার পাথর। গবেষকরা বলছেন, কিছু এলাকায় পাথরের স্তর ৯ মিটার পর্যন্ত গভীরতায় বিস্তৃত হতে পারে, যা এখনো পুরোপুরি জরিপের আওতায় আসেনি। ফলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান চালানো হলে প্রকৃত মজুতের পরিমাণ বর্তমান হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরিমাণ নয়, সিলেট অঞ্চলের পাথরের গুণগত মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। গবেষণায় পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, এখানে গ্রানাইট, কোয়ার্টজাইট, ব্যাসল্ট ও গ্লাইসজাতীয় শিলা রয়েছে। এসব শিলার আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৬৫ থেকে ৩.১২ পর্যন্ত এবং পানি শোষণ হার অত্যন্ত কম, যা নির্মাণকাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পাথরগুলো কম ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী এবং কংক্রিটের সঙ্গে ভালো বন্ধন তৈরি করতে সক্ষম। পরীক্ষায় এসব শিলার সংকোচন সহনশীলতাও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সন্তোষজনক পাওয়া গেছে।
গবেষকরা বলছেন, এসব পাথর সড়ক নির্মাণ, রেলপথের ব্যালাস্ট, নদীতীর সংরক্ষণ, সেতুর সংযোগপথ, বাঁধ নির্মাণ এবং জলবাহী অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহারের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, আগামী কয়েক দশকেও দেশে পাথরের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকবে। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, গভীর সমুদ্রবন্দর, নতুন রেললাইন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে বিপুল পরিমাণ অ্যাগ্রিগেট প্রয়োজন হবে। সেই চাহিদা পূরণে যদি স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করা যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিলেটের শিলাসম্পদকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে। পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ, পরীক্ষাগার, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সীমান্তঘেঁষা সিলেট অঞ্চলে শিল্পায়নের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকলেও এই খাত স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। বিশেষ করে যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
গবেষক খাইরুল কবির আদিল বলেন, দেশের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে সিলেটের শিলাসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উত্তোলন নীতি। তার মতে, এলোমেলোভাবে পাথর উত্তোলন করলে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হবে। তাই সরকার, গবেষক এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ এখনও নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়। তিনি বলেন, সিলেটের মাটি ও নদীর নিচে লুকিয়ে থাকা এই সম্পদকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং সংরক্ষণ করতে হবে। পরিকল্পনাহীন উত্তোলনের বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাবে।
তবে সম্ভাবনার এই আলোচনার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ ও ডাউকি অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য নয়, পর্যটনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আবারও যদি একইভাবে অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়, তাহলে তা ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীর তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে ভাঙন বাড়তে পারে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হতে পারে এবং পর্যটনখাতও ক্ষতির মুখে পড়বে। পাশাপাশি পাহাড় ও নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই শিলাসম্পদ আহরণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং কঠোর তদারকি অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সঠিকভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করা গেলে এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য বাড়লে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সরকারকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের শিলাসম্পদ শুধু একটি অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই সম্পদ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। এখন দেখার বিষয়, গবেষণায় উঠে আসা এই সম্ভাবনাকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।


