প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
‘স্কুল মাদরাসাদি শিক্ষাদীক্ষার আছে বিধি, মধ্যে বহে কালনী নদী তাতে কালো জল’—বাংলার কিংবদন্তি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের এই কালজয়ী গানের পঙ্ক্তি শুধু একটি নদীর কথা বলে না, বরং ভাটিবাংলার জীবন, সংস্কৃতি, প্রেম, প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্বের গল্প বলে। যে কালনী নদী একসময় ছিল জীবনের প্রতীক, মাছের ভাণ্ডার, নৌযাত্রার পথ এবং লোকসংস্কৃতির প্রাণ, সেই নদী আজ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। প্লাস্টিক বর্জ্যের অবাধ বিস্তার, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মানবসৃষ্ট দূষণের কারণে কালনী নদী ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক রূপ ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। কালনী নদীর পানি ব্যবহারকারী নদীতীরবর্তী প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত। গবেষকরা মনে করছেন, নদীর পানিতে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ এবং এর সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, এই দূষণ নদীর জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস: প্লাস্টিকস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিকে কালনী নদীতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদ, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য বিভাগ, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ এবং জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণে পরিচালিত এই গবেষণা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিবেশগত বাস্তবতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
গবেষণার অংশ হিসেবে কালনী নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় আটটি পৃথক স্টেশন থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষকরা নদীর পানি, নদীতীর এবং আশপাশের কৃষিজমি থেকে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেন। এসব বর্জ্যের মধ্যে ছিল পলিথিন ব্যাগ, পানীয়ের বোতল, খাবারের মোড়ক, প্লাস্টিকের বস্তা, ওষুধ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা সামগ্রীর প্যাকেট, ফোম, প্লাস্টিক টেবিলক্লথ এমনকি ব্যবহৃত জুতাও।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদীতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পিইটি (PET) এবং এলডিপিই (LDPE) ধরনের প্লাস্টিক। এর মধ্যে পানির বোতল ও পলিথিন ব্যাগের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। গবেষকরা নদীর বিভিন্ন অংশকে S1 থেকে S8 পর্যন্ত চিহ্নিত করেন এবং S1, S2 ও S5 এলাকাকে সবচেয়ে বেশি দূষণপ্রবণ হিসেবে শনাক্ত করেন। বিশেষ করে S2 এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে সর্বোচ্চ পরিমাণ ম্যাক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণার ফলাফল বলছে, যেসব এলাকায় মানুষের বসতি, বাজার, নৌযান চলাচল, মাছ ধরা এবং বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বেশি, সেসব এলাকাতেই প্লাস্টিকের ঘনত্বও বেশি। নদীর ধীরগতির অংশ এবং বাঁকগুলোতে এসব বর্জ্য দীর্ঘ সময় জমে থাকে, ফলে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ে। বড় আকারের প্লাস্টিক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এসব কণা পানির সঙ্গে মিশে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষায়ও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। তাপমাত্রা, পিএইচ, টিডিএস এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনসহ বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন অংশে পানির মানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কিছু এলাকায় শিল্পবর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক এবং গৃহস্থালি বর্জ্যের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। পানি দূষণ সূচকের মান ২ দশমিক ৬১ থেকে ২ দশমিক ৯৫-এর মধ্যে পাওয়া গেছে, যা নদীটিকে ‘মধ্যম মাত্রার দূষিত’ হিসেবে নির্দেশ করে।
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশ ছিল নদীতীরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি। ১২৬ জন বাসিন্দার ওপর পরিচালিত সামাজিক জরিপে দেখা যায়, নদীর পানি ব্যবহারকারী অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে চর্মরোগ, অ্যালার্জি, চুলকানি এবং ত্বকের প্রদাহ। নদীর পানি ব্যবহারকারীদের প্রায় ৬৫ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা ত্বকজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।
গবেষকরা বলছেন, নদীর পানি দিয়ে নিয়মিত গোসল, কাপড় ধোয়া, রান্না এবং গৃহস্থালি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার ফলে দীর্ঘমেয়াদে দূষিত পানির সংস্পর্শে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে থাকা রাসায়নিক উপাদান মানুষের ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
কালনী নদী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটি সুরমা-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং স্থানীয় অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে, খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
দিরাইয়ের বাসিন্দা মুজাহিদ সর্দার তালহার ভাষায়, কালনী নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি এই অঞ্চলের মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। তিনি বলেন, একসময় নদীর স্বচ্ছ পানি, মাছের প্রাচুর্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে নদীর পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যায় প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও নানা বর্জ্যের স্তূপ। পানির রং ও গন্ধ বদলে গেছে, মাছ কমে গেছে এবং নদী যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (হাউস)-এর নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, কালনী নদীর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, নদীতীরবর্তী বাজার, বসতি এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড থেকে সরাসরি প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকারের কার্যকর উদ্যোগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কালনী নদী তার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশগত পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। যে নদী একসময় শাহ আবদুল করিমের গানে জীবন ও প্রকৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই নদীকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম হয়তো কালনী নদীকে শুধু ইতিহাসের পাতায় কিংবা বাউল গানের স্মৃতিতেই খুঁজে পাবে।


