প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগজুড়ে বিদ্যুতের তীব্র সংকট এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। টানা লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। নগর এলাকায় কিছুটা বিরতি দিয়ে বিদ্যুৎ মিললেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক। কোথাও কোথাও দিনে-রাতে মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন যাবে—এ অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটছে দিন-রাত। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে অচলাবস্থা। গরমের এই সময়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরিস্থিতি এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে প্রস্তুতির সময়টুকু যেন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অনেকে অনলাইন নির্ভর প্রস্তুতিতেও অংশ নিতে পারছেন না। নগরীর সুবিদবাজার এলাকার পরীক্ষার্থী নিশানী পাল জানায়, দিনে ও রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মতো আরও অসংখ্য শিক্ষার্থী এখন একই সমস্যার মুখোমুখি।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হাসপাতালগুলোতেও চাপ বেড়েছে। যদিও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবুও সামগ্রিক সংকটের প্রভাব পুরো ব্যবস্থার ওপর পড়ছে। অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে, যা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সেবার ব্যয়ও বাড়িয়ে তুলছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। দোকানপাট ও মার্কেটগুলোতে দিনের শেষভাগে ব্যবসা জমে ওঠার আগেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেককে দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও ফাস্টফুড ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ না থাকার সময়কাল শহরের তুলনায় অনেক বেশি। অনেক এলাকায় দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। কৃষিনির্ভর অঞ্চলে সেচ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতির কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। সিলেট অঞ্চলে মোট চাহিদা যেখানে প্রায় ১৭৫ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১৪৫ মেগাওয়াট। একইভাবে পল্লী বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এই ঘাটতির ফলে বাধ্য হয়ে রোটেশন ভিত্তিতে লোডশেডিং চালানো হচ্ছে।
এদিকে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকাও সংকটকে আরও তীব্র করেছে। যদিও অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রয়েছে, তবুও সামগ্রিক উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় কম। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব, জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং যান্ত্রিক ত্রুটি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ চলে গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ফোন রিসিভ করা হয় না, ফলে ভুক্তভোগীরা কোনো তথ্য বা সহায়তা পান না। এতে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়ছে। সুনামগঞ্জের এক অভিভাবক জানান, পরীক্ষার সময় এমন অনিশ্চয়তা আগে কখনও দেখেননি। অন্যদিকে এক ব্যবসায়ী বলেন, বিদ্যুৎ ছাড়া তার ডিজিটাল মেশিন চালানো সম্ভব নয়, ফলে প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিনি।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের একাংশের দাবি, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতিরই প্রতিফলন। গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে সিলেটের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একটি বড় সংকেত দিচ্ছে—শুধু তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সংকট নিরসনে উদ্যোগী হবে এবং অন্তত পরীক্ষার সময়টুকুতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে।


