প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সীমান্তে আবারও বড় ধরনের চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পৃথক অভিযানে একটি বিলাসবহুল ‘রয়েল এনফিল্ড’ মোটরসাইকেলসহ প্রায় দুই কোটি টাকার বিভিন্ন অবৈধ ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাচারের সময়ও কিছু পণ্য আটক করা হয়েছে। সীমান্তজুড়ে চোরাচালান চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিজিবির এই অভিযান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রোববার (৩ মে) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) তাদের দায়িত্বাধীন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করে। ব্যাটালিয়ন সদর ছাড়াও বাংলাবাজার, কালাইরাগ, মিনাটিলা, সংগ্রাম, বিছনাকান্দি, প্রতাপপুর ও শ্রীপুর সীমান্ত এলাকায় পৃথক টহল ও অভিযানের মাধ্যমে এসব পণ্য জব্দ করা হয়।
বিজিবি সূত্র জানায়, অভিযানে ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা একটি রয়েল এনফিল্ড মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা, স্কিন ব্রাইট ক্রিম, ক্লপ জি ক্রিম, অ্যালোভেরা জেল, সানগ্লাস, বিস্কুট, চকলেট, ফুচকা, টুথপেস্ট এবং মদ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ভারতীয় মহিষও জব্দ করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে পাচারের সময় শিং মাছ, সুপারি ও ট্রাউজার আটক করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে পাথর পরিবহনে ব্যবহৃত একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলি পাথরসহ জব্দ করা হয়।
আটককৃত সব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৯০ লাখ ৮ হাজার ৭০ টাকা বলে জানিয়েছে বিজিবি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তপথে উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেল, প্রসাধনী ও খাদ্যপণ্য চোরাচালানের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় বিলাসবহুল মোটরসাইকেলের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ায় এসব যানবাহন অবৈধ পথে দেশে আনার চেষ্টা করছে চোরাকারবারিরা।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন চোরাচালান চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধার কিংবা ভোরের দিকে সীমান্তের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এসব পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও কিছু পণ্য অবৈধভাবে ভারতে পাচার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, এটি স্থানীয় সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অবৈধ পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক সময় চোরাচালান চক্র মাদক, অস্ত্র বা নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনেও একই রুট ব্যবহার করে থাকে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করে।
সিলেট অঞ্চলের সীমান্তগুলো ভৌগোলিকভাবে অনেকটাই দুর্গম হওয়ায় চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে নদী, পাহাড়ি এলাকা এবং বিস্তীর্ণ সীমান্তপথ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সক্রিয় থাকে। তবে বিজিবি বলছে, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহলের কারণে অনেক বড় চালান আটক করা সম্ভব হচ্ছে।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর অধিনায়ক এক বিবৃতিতে জানান, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, মাদক, অবৈধ পণ্য ও অন্যান্য চোরাচালান বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আটককৃত মালামালের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। উদ্ধার হওয়া পণ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি এসব চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রকে শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়েই সীমান্তে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অনেকেই অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রুত লাভের আশায় এই অবৈধ পথে জড়িয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চোরাচালান দেশের বৈধ বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। অবৈধ পথে আসা বিদেশি পণ্য বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্র হারায় বিপুল পরিমাণ শুল্ক ও কর। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সীমান্তে একের পর এক অভিযান ও পণ্য জব্দের ঘটনা প্রমাণ করছে যে, চোরাচালান চক্র এখনো সক্রিয়। তবে বিজিবির ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকলে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


