প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি জাফলং। পাহাড়, ঝরনা, পাথর আর স্বচ্ছ পানির পিয়াইন নদী দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন এখানে। আনন্দ, ভ্রমণ আর স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত কাটানোর প্রত্যাশায় আসা মানুষদের জন্য জাফলং এক অনন্য গন্তব্য। কিন্তু সেই আনন্দ ভ্রমণই এবার এক পরিবারের জন্য পরিণত হয়েছে আজীবনের বেদনায়। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসে পিয়াইন নদীর পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে ১৬ বছর বয়সী কিশোর ইমতিয়াজ হোসেন রাহি।
সোমবার বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র জাফলংয়ের নাজিমগড় নৌকাঘাটসংলগ্ন এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ইমতিয়াজ হোসেন রাহি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফতেহাবাদ গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের ছেলে। তার আকস্মিক মৃত্যু পরিবার, স্বজন এবং বন্ধুদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সোমবার সকালে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে জাফলংয়ে ঘুরতে আসেন রাহি। দিনভর তারা পর্যটনকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বিকেলের দিকে তারা নাজিমগড় নৌকাঘাট এলাকার কাছে অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে সাঁতরে পিয়াইন নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় নদীর স্রোতের তীব্রতায় রাহি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে তলিয়ে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বন্ধুরা রাহিকে খুঁজে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। কিন্তু নদীর গভীরতা এবং প্রবল স্রোতের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ, গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ এবং স্থানীয় ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর শুরু হয় সমন্বিত উদ্ধার অভিযান। নদীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী টানা চেষ্টার পর ডুবুরিরা নদীর তলদেশ থেকে রাহির মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত তীরে নিয়ে আসা হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উপস্থিত লোকজনের মধ্যে শোকের আবহ নেমে আসে। যারা কিছুক্ষণ আগেও তাকে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে দেখেছেন, তাদের অনেকেই এ দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মরদেহ উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে এবং নিহতের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।
জাফলংয়ে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা বেড়াতে আসেন। বিশেষ করে ছুটির দিন এবং পর্যটন মৌসুমে এখানে মানুষের ভিড় অনেক বেড়ে যায়। তবে স্থানীয়দের মতে, পিয়াইন নদীর কিছু অংশে পানির গভীরতা এবং স্রোতের তীব্রতা সম্পর্কে অনেক পর্যটকের পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। ফলে অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর কিছু অংশ দেখতে শান্ত মনে হলেও হঠাৎ গভীরতা বৃদ্ধি এবং পানির নিচের অনিয়মিত প্রবাহ অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যারা এলাকা সম্পর্কে অপরিচিত, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। এ কারণে পর্যটকদের নির্ধারিত নিরাপদ এলাকার বাইরে পানিতে নামা বা নদী সাঁতরে পার হওয়ার চেষ্টা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাফলংয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। অনেক সময় তরুণ পর্যটকরা রোমাঞ্চ বা সাহসিকতার অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তারা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আরও বেশি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
রাহির মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যে বয়সে একজন কিশোরের সামনে অসংখ্য স্বপ্ন ও সম্ভাবনা থাকে, সেই বয়সেই একটি আনন্দভ্রমণ তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। পরিবারের কাছে এটি এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়।
চট্টগ্রামে থাকা রাহির পরিবারের সদস্যরা সংবাদ পাওয়ার পর শোকাহত হয়ে পড়েন। প্রিয় সন্তানের এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবর তাদের জন্য ছিল অকল্পনীয় এক আঘাত। স্বজনদের কান্না আর বন্ধুদের স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে এক প্রাণবন্ত কিশোরের গল্প, যার জীবন থেমে গেল সময়ের অনেক আগেই।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী, ঝরনা ও জলকেন্দ্রিক পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নির্দেশনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। কারণ সামান্য অসতর্কতা কখনো কখনো একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে।
পিয়াইন নদীর তীরে সোমবারের সেই বিকেল হয়তো অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা পরিণত হয়েছে এক মর্মান্তিক স্মৃতিতে। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে এসে প্রাণ হারানো কিশোর ইমতিয়াজ হোসেন রাহির মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রকৃতির কিছু অদৃশ্য ঝুঁকিও রয়েছে, যেগুলোকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।


