সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের ৫ দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় চলচ্চিত্রের খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ তিন দশক ধরে নানা তদন্ত, প্রতিবেদন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও পরিবারের অভিযোগের মধ্য দিয়ে চলা এই মামলায় ডনের গ্রেপ্তার এবং এবার রিমান্ডের আদেশ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের শুনানি শেষে ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন।

আদালতে শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে ডনের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। প্রয়োজন হলে তাকে কারাগারের গেটে বা কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের বিকল্প প্রস্তাবও দেওয়া হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের আদেশ দেন।

সিআইডির রিমান্ড আবেদনে মামলাটিকে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে তার মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ তুলে আসছেন। ফলে মামলার বর্তমান তদন্তে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে তদন্ত সংস্থা।

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা সহজ হতে পারে।

এ ছাড়া বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ডন কী কারণে এবং কার প্ররোচনায় বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও তদন্তের বিষয় এখনো আদালতে বিচারাধীন; রিমান্ডে নেওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়।

ডনকে গত ৯ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নাকচ করেন। এরপর তদন্ত সংস্থা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করে।

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয় গত বছর। সালমানের মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম গত বছরের ২০ অক্টোবর মামলাটি করেন। সেখানে চিত্রনায়ক সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয় এবং সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। ডনও ওই মামলার আসামিদের একজন।

তবে সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকে এ ঘটনায় একাধিক দফায় তদন্ত হয়েছে এবং প্রতিটি তদন্তের ফলাফল নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি চলচ্চিত্রে সালমান শাহ নামে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।

প্রথমে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ওই ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের আবেদন করেন তিনি। আদালত তখন সিআইডিকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি তার পরিবার। সালমানের বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী সিআইডির প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে রিভিশন মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।

দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেই প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে তাতেও সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়নি।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সালমানের মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন। এরপর মামলাটি র‌্যাবের কাছে তদন্তের জন্য যায়। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত র‌্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।

এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই। দীর্ঘ চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনা সম্পর্কে ৫৪ জনের সাক্ষ্য ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করেও হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুর পেছনে পারিবারিক কলহ ও মানসিক অস্থিরতার বিষয় সামনে আসে। বিশেষ করে চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং স্ত্রী সামিরার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পিবিআইয়ের মতে, এসব কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে সালমান আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।

তবে ওই প্রতিবেদনও সালমানের মা মেনে নেননি। এরপর মামলাটি নিয়ে আবার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন। পরবর্তীতে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশনের আবেদন করা হয়।

২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সেই রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন এবং অভিযোগ তদন্তের আদেশ দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় মামলাটি আবার নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে। তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে সালমান শাহর দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত ২০ মে তদন্ত কর্মকর্তা একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। পরে আদালত দেহাবশেষ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং পুনরায় ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন।

সালমানের পরিবার অবশ্য দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ বাতিলের আবেদন করেছিল। বিষয়টি আদালতে নথিভুক্ত করা হয়। পরে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। ফলে ডনের রিমান্ড এবং চলমান তদন্ত—দুই ঘটনাই মামলাটিকে আবারও জনআলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পরও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্নের অবসান হয়নি। একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এলেও পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। এখন নতুন তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং আদালতে তা কীভাবে মূল্যায়িত হয়, সেটিই হয়ে উঠেছে মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সবশেষে ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ডের মাধ্যমে তদন্তকারীরা মামলার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কোনো নতুন উত্তর খুঁজে পান কি না, সেদিকেই নজর থাকবে। তবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মামলার কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৯/১১ হামলার বিচার শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৯/১১ হামলার বিচার শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতীয় কবি নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাগর-রুনি হত্যা: ১২৯ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ২৭০, নিখোঁজ ১৩০০

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ