প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিনা দরপত্রে রাজধানীর ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ১৫ মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসকে খালাস দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলাগুলোর অন্য আসামিদেরও খালাস দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান এ রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাগুলোর রায়ে মির্জা আব্বাসসহ সংশ্লিষ্ট আসামিরা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেন।
মামলাগুলোর অভিযোগ ছিল, রাজধানীর ১৮টি পরিত্যক্ত সরকারি বাড়ি রাজউকের মাধ্যমে সাজানো দরপত্র ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পাইয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সরকারি সম্পদের মূল্য কমিয়ে দেখানোসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল দুদক।
দুদকের মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এসব অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের মোট ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে মির্জা আব্বাসসহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলাগুলোর অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা পরিত্যক্ত বাড়িগুলো বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং দরপত্রে কারচুপি ও প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের কাছে বাড়িগুলো হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর ফলে সরকারি সম্পদের যথাযথ মূল্য পাওয়া যায়নি এবং রাষ্ট্র আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
দুদকের দায়ের করা ১৫ মামলার প্রতিটিতে মির্জা আব্বাসসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় তার সঙ্গে আসামি ছিলেন এস এম জাফর উল্লাহ, মো. এমদাদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, গোলাম নবী, কাজী রিয়াজুল মনির, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সাদেক, হুমায়ন খান, মীর মোশাররফ হোসেন, ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী ও মো. শহীদ আলম।
এ ছাড়া বিএনপির নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দুটি মামলায় আসামি করা হয়েছিল। ব্যবসায়ী আহমেদ আকবর সোবহানকেও দুটি মামলায় আসামি করা হয়। অন্যান্য মামলায় মেহেদী হাসান, শফিকুর রহমান কিরন, নুরুচ্ছাফা, মো. শুকুর মিয়া, হাসনা আহমেদ ও আলী হায়দার চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে তারাও অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন।
মামলাগুলো দায়েরের সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশন এসব মামলা করে। পরে মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের বিভিন্ন আইনি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় আদালতে চলতে থাকে। প্রায় দুই দশক পর বৃহস্পতিবার এসব মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
রায়ে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে তাদের দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পেয়েছে কি না, সেটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শেষ পর্যন্ত মির্জা আব্বাসসহ মামলাগুলোর আসামিরা খালাস পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
মির্জা আব্বাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে তিনি সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি সম্পত্তি বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগে ২০০৭ সালে দায়ের হওয়া এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও আদালতের রায়ে তিনি খালাস পেলেন।
তবে মামলার অভিযোগের বিষয়টি ছিল সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও দরপত্র প্রক্রিয়াকে ঘিরে। সরকারি সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং বাজারমূল্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এসব মামলার বিচার দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে আলোচিত ছিল।
দুদকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, সরকারি বাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। অপরদিকে আসামিপক্ষ শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত রায় ঘোষণা করেন।
একই সঙ্গে এ রায় বাংলাদেশের দুর্নীতি মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ২০০৭ সালে মামলা দায়েরের পর অভিযোগ গঠন করা হয় একই বছর। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মামলাগুলো বিচারাধীন থাকার পর ২০২৬ সালে এসে রায় হলো। অর্থাৎ মামলা দায়েরের প্রায় ১৯ বছর পর এর বিচারিক নিষ্পত্তি হলো।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বিভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়, তার চূড়ান্ত উত্তর আদালতের রায়ের মধ্য দিয়েই পাওয়ার কথা। এবারের রায়ে মির্জা আব্বাসসহ সব আসামিকে খালাস দেওয়ার ফলে মামলাগুলোর অভিযোগ আদালতের বিচারে টেকেনি।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে মির্জা আব্বাস ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে এসব ১৫ মামলার বিচারিক দায় আর থাকল না। দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাগুলোর অবসান রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মির্জা আব্বাসের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা পুরোনো দুর্নীতি মামলায় খালাসের বিষয়টি বিএনপির রাজনৈতিক পরিসরেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে আদালতের রায় একটি নির্দিষ্ট মামলার বিচারিক ফলাফল নির্ধারণ করে। সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, দরপত্রে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রিকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই দশক আগে যে অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল, বৃহস্পতিবারের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের আইনি পরিসমাপ্তি ঘটল।


