৯/১১ হামলার বিচার শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাগুলোর একটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার প্রায় ২৭ বছর পর শুরু হতে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার। হামলার পরিকল্পনার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তাঁর তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরুর জন্য ২০২৮ সালের ৫ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন একজন মার্কিন সামরিক বিচারক। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচারপূর্ব আইনি জটিলতাগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বুধবার মার্কিন বিমান বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল শ্রামার বিচার-সময়সূচি নির্ধারণ করে একটি আদেশ জারি করেন। এতে খালিদ শেখ মোহাম্মদ, ওয়ালিদ বিন আত্তাশ, আলী আব্দুল আজিজ আলী এবং মুস্তফা আল-হাউসাভির বিচার শুরুর দিন হিসেবে ২০২৮ সালের ৫ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। চার আসামিই বর্তমানে কিউবার গুয়ান্তানামো বে এলাকায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আটক রয়েছেন।

তবে নতুন তারিখ ঘোষণা হলেও বিচার আদৌ ওই দিন শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। কারণ গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে এই মামলার বিচার শুরু করার জন্য একাধিকবার সময় নির্ধারণ করা হলেও নানা আইনি জটিলতায় তা পিছিয়ে গেছে। ২০২১ সালেও বিচার শুরুর একটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটি বাতিল হয়ে যায়।

সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আগে প্রসিকিউশন পক্ষ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বিচার শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের বিভিন্ন আবেদন, বিচারপূর্ব শুনানি এবং আদালতে কোন কোন তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আরও সময় প্রয়োজন বলে বিচারক মনে করেন। ফলে প্রায় এক বছর পাঁচ মাস পিছিয়ে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই হামলা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিন চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে দুটি বিমান নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। আরেকটি বিমান আঘাত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, বৈদেশিক নীতি এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আমূল বদলে যায়। ওই হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন। অসংখ্য পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জনকে। হামলার প্রায় এক প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবারের কাছে বিচার পাওয়ার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।

এই মামলার প্রধান আসামি খালিদ শেখ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ৯/১১ হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে ২০০৩ সালে পাকিস্তানে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপন আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ওয়াটারবোর্ডিংসহ বিভিন্ন কঠোর পদ্ধতির মুখোমুখি করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন মার্কিন নথি ও তদন্তে উঠে এসেছে।

মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আসামিদের ওপর চালানো ওই জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য। এসব তথ্য আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে বহু বছর ধরে আইনি বিতর্ক চলছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়ে আসছেন, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো বিচার পরিচালনা করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।

অন্যদিকে প্রসিকিউশনকে বিপুল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আইনি প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি, তাদের বক্তব্য সংগ্রহের পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক আদালতে এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে একের পর এক শুনানি হয়েছে। এসব বিষয় নিষ্পত্তি না হলে মূল বিচারপর্বে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মামলাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে গুয়ান্তানামো বে সামরিক কমিশনের কাঠামো। সাধারণ বেসামরিক আদালতের পরিবর্তে বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার করার সিদ্ধান্তের কারণে মামলার এখতিয়ার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রমাণ গ্রহণের নিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে মামলাটি শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার বিচার নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকার নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

২০২৪ সালে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির একটি সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। সে সময় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা বাদ দিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিনিময়ে আসামিরা দোষ স্বীকার করতে পারেন—এমন একটি সমঝোতার কথা সামনে আসে।

কিন্তু সেই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দেয়। ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্বজনদের অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এত বছর অপেক্ষার পর তারা পূর্ণাঙ্গ বিচার এবং হামলার জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির সুযোগ দেখতে চান। রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক পর্যায়ের আপত্তির মধ্যে শেষ পর্যন্ত ওই সমঝোতা বাতিল হয়ে যায়। ফলে মামলাটি আবার পূর্ণাঙ্গ বিচারপ্রক্রিয়ার দিকেই এগোয়।

এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষভাবে বেদনাদায়ক। ২০০১ সালে যারা স্বজন হারিয়েছিলেন, তাদের অনেকের বয়স এখন অনেক বেড়েছে। ইতোমধ্যে নিহতদের বাবা-মা ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ অনেক সদস্য মারা গেছেন। তারা জীবদ্দশায় এই মামলার চূড়ান্ত বিচার দেখে যেতে পারেননি। ফলে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য বিচার শুরুর তারিখ অনেক পরিবারের কাছে একই সঙ্গে আশা ও দীর্ঘ অপেক্ষার স্মৃতি বহন করছে।

মামলার চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা আইনগতভাবে দোষী নন। আদালতে প্রসিকিউশনকে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে এবং আসামিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে আগের জিজ্ঞাসাবাদে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সেই সময় সংগৃহীত তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৮ সালের ৫ জুন বিচার শুরু করার সিদ্ধান্ত তাই মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এটিকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের আগে এখনো বহু বিচারপূর্ব আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে হবে। এসব প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো জটিলতা দেখা দিলে বিচার আবারও পিছিয়ে যেতে পারে।

তারপরও প্রায় ২৭ বছর ধরে চলা এই মামলায় একটি নির্দিষ্ট বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও নিরাপত্তা অভিযানে প্রবেশ করেছিল, সেই অধ্যায়ের একটি বড় আইনি পরিণতি হতে পারে এই বিচার।

নিউইয়র্কের ধ্বংসস্তূপ, পেন্টাগনের ক্ষত এবং পেনসিলভানিয়ার সেই বিধ্বস্ত বিমানের স্মৃতি বহু বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনে অমলিন। প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির সেই ঘটনার বিচার এখনো শুরু না হওয়া বিশ্বজুড়ে আইন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৮ সালের জুনে যদি শেষ পর্যন্ত বিচার শুরু হয়, তাহলে তা হবে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বহু প্রতীক্ষিত একটি বিচারিক অধ্যায়ের সূচনা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতীয় কবি নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতীয় কবি নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাগর-রুনি হত্যা: ১২৯ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের ৫ দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ২৭০, নিখোঁজ ১৩০০

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ