প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা: আলোচিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে বিশ্ব মুসলিম পরিবারের আত্মরক্ষার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট সদস্য দেশগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে তিনি চুক্তিটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কথা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর বিক্রম মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রুমিন ফারহানা তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, আলোচিত মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হলে দেশের কী ধরনের লাভ হতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাঁর ভাষায়, এটি বিশ্ব মুসলিম পরিবারের আত্মরক্ষার বিষয়। তবে বাংলাদেশ এতে যুক্ত হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত সদস্য দেশগুলোর ইচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের পর মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কায় চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ায় এর রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা। স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে এটি শুধু দ্বিপক্ষীয় বা সাময়িক কোনো নিরাপত্তা সমঝোতা নয়; বরং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ এই ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হলে সম্ভাব্য সুবিধার বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এর একটি সম্ভাব্য দিক হতে পারে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুবিধা কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামো এবং বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ধরন কী হয় তার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি যদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সম্ভাব্য লাভ বিবেচনা করলেই হয় না। এর সঙ্গে কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশ, বৃহৎ শক্তি এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশের এমন কোনো উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কোনো সামরিক সংঘাতে জোটের সদস্যদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি সক্রিয় হলে বাংলাদেশকে তার পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, বাংলাদেশ এই প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। একদিকে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ। ফলে বাংলাদেশের জন্য চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু ধর্মীয় বা আবেগের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুক্তিটির প্রকৃত কার্যপরিধি। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার আগে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক বাধ্যবাধকতা, যুদ্ধ বা সংঘাতের ক্ষেত্রে দায়িত্ব, যৌথ সামরিক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি কোনো পর্যায়ে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে এগোয়, তাহলে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কোনো নির্দিষ্ট শক্তির বলয়ে অতিরিক্তভাবে না জড়ানো। ফলে মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য কতটা থাকবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর ইচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা আপাতত সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার মধ্যেই রয়েছে।
মক্কা চুক্তিকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে উঠবে কি না, সেটিও এখন দেখার বিষয়। চুক্তিটি কার্যকরভাবে কতটা সামরিক সহযোগিতা তৈরি করতে পারে এবং এতে নতুন কোনো দেশ যুক্ত হবে কি না, তা সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্তটি হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্যে আপাতত যে বার্তা পাওয়া গেছে, তা হলো বাংলাদেশ উদ্যোগটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে, তবে যোগদানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে যায়নি।

