প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজও আদালতে জমা পড়েনি। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে আলোচিত এই মামলায় প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আবারও নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে। এ নিয়ে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৯ বার পেছাল।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। ফলে আদালত নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এক যুগেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর একটি বাসায় ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড আজও দেশের সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে গভীরভাবে আলোচিত। সময়ের সঙ্গে মামলার তদন্তের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার হাতে গেলেও হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। বারবার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ নির্ধারণ এবং তা পিছিয়ে যাওয়ায় মামলাটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের পাশাপাশি হতাশাও বাড়ছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুজনকেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সে সময় সাগর সরওয়ার মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর স্ত্রী মেহেরুন রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক।
ঘটনার পর সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে দ্রুত হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি ওঠে। রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। শুরুতে থানা-পুলিশ মামলাটির তদন্ত করলেও পরে তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে।
ডিবির তদন্তেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব)। দীর্ঘ সময় র্যাব মামলাটি তদন্ত করে। তবে শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন এবং আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল সম্ভব হয়নি।
এরপর ঘটনার এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। গত বছরের নভেম্বরে র্যাবের কাছ থেকে মামলার নথিপত্র বুঝে নেয় সংস্থাটি। এরপর নতুন করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে পিবিআই। তদন্তের অংশ হিসেবে মামলার নথি, আগের তদন্তের তথ্য এবং বিভিন্ন আলামত পর্যালোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও করা হয়।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব পরিবর্তন হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। আদালত বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন না আসায় নতুন তারিখ ধার্য হয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলো। বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মামলাটি নিয়ে দেশের সাংবাদিক সমাজের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। হত্যার কারণ কী ছিল, কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং কেন এত দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ হয়নি—এসব প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার হাতে যাওয়ার বিষয়টিও এর দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম আলোচিত দিক। থানা-পুলিশ থেকে ডিবি, এরপর র্যাব এবং সর্বশেষ পিবিআই—একাধিক তদন্তকারী সংস্থা পরিবর্তন হলেও এখন পর্যন্ত আদালতে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসেনি, যার ভিত্তিতে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যায়।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, বৃহত্তর সমাজেও নানা প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে নিহত দুজনই সাংবাদিক হওয়ায় ঘটনাটি শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যমের নজরে ছিল। তাঁদের সহকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন সময়ে হত্যার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
সাগর-রুনির স্বজনদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার এই সময় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রিয়জন হারানোর ক্ষত নিয়ে বছরের পর বছর তদন্তের অগ্রগতির অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে তাঁদের। আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন নতুন তারিখ এলেও যখন তা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নেয় না, তখন প্রত্যাশার পাশাপাশি হতাশাও তৈরি হয়।
তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে পিবিআই এখন মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে। আগের তদন্তের নথি বুঝে নেওয়ার পর সংস্থাটি নতুন করে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছে। তবে তদন্তের স্বার্থে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা প্রতিবেদন কেন নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে বৃহস্পতিবারের শুনানির পর নতুন করে ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন ওই তারিখে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারে কি না, সেটিই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার তদন্তের একটি সুস্পষ্ট পরিণতি দেখতে চান নিহত সাংবাদিক দম্পতির স্বজন, সহকর্মী এবং সংশ্লিষ্টরা।
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা না পড়া দেশের বিচারব্যবস্থা ও তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১২৯ বার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার ঘটনা মামলাটির দীর্ঘসূত্রতারই প্রতিচ্ছবি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসানের পথে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগোবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।


