প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের অমর ও জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সবার কাছে প্রিয় মুখ ‘সালমান শাহ’ নামে পরিচিত, তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর দীর্ঘ তিন দশক পর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। বাংলা সিনেমার সোনালী যুগের অন্যতম জনপ্রিয় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করার পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র আইনি লড়াই ও জল্পনা-কল্পনা। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার ঢাকার আদালতে ডনের পক্ষে জামিন আবেদন করা হলেও আদালত তা সরাসরি নামঞ্জুর করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মামলার প্রতিটি মোড়েই সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের নজর আটকে আছে, কারণ দেশের চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় নায়কের আকস্মিক প্রয়াণ আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে রেখেছে।
বুধবার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে আলোচিত এই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারিক প্যানেলের সামনে আসামিপক্ষের হয়ে জামিন প্রার্থনা করে জোরালো সওয়াল করেন আইনজীবী মো. তরিকুল ইসলাম জুয়েল। তিনি আদালতের কাছে দাবি করেন যে, অভিযুক্ত হাজতি আসামি আশরাফুল হক ডনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক এজাহার কিংবা পরবর্তীতে দাখিল করা গ্রেপ্তারিসংক্রান্ত ফরোয়ার্ডিংয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা প্রত্যক্ষ অভিযোগের উল্লেখ নেই। কথিত এই মানবতাবিরোধী বা অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে ডন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করে তাঁর মক্কেলের জামিন মঞ্জুরের জন্য আদালতের নিকট আবেদন জানান তিনি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি মামলার গুরুত্ব এবং অভিযোগের গভীরতা তুলে ধরে আসামির জামিনের তীব্র আপত্তি জানান। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ ও চুলচেরা আইনি যুক্তিপ্রদর্শন এবং নথি পর্যালোচনার পর বিচারক আসামির জামিন আবেদন সম্পূর্ণ নামঞ্জুর করে তাঁকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন।
এর আগে গত ৯ আগস্ট ভোরের দিকে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতিতে খলনায়ক ডনকে আটক করা হয়। জানা গেছে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত চলমান থাকায় এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ডনের দেশত্যাগের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ইমিগ্রেশন অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। গত ৯ আগস্ট পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গমনের জন্য তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সিআইডিকে অবহিত করলে সিআইডির একটি দল তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। বিমানবন্দর থেকে আটকের পর ওইদিনই বিকেলে তাঁকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয় এবং মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আরিফুর রহমান তাঁকে কারাগারে আটক রাখার জন্য আদালতের নিকট আবেদন জানান। সেই আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করে বিচারক সেদিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী চিত্রনায়ক সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ বাসভবনে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। শুরুর দিকে চলচ্চিত্রাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁর এই মৃত্যুকে নিছক আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও প্রয়াত নায়কের পরিবার ও ভক্তরা শুরু থেকেই একে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্টের মারপ্যাচে মামলাটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকলেও সম্প্রতি এটি নতুন গতি লাভ করে। গত বছরের ২০ অক্টোবর অমর নায়ক সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় একটি নতুন হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ মোট ১১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারভুক্ত অপর অভিযুক্ত আসামিরা হলেন সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, দেশের ব্যবসায়ী মহলের পরিচিত মুখ আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলে আসা এই রহস্যের জট খুলতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ডনের মতো দীর্ঘদিনের পরিচিত সহকর্মীর নাম জড়িয়ে পড়া এবং তাঁর গ্রেপ্তারের পর জামিন নামঞ্জুরের ঘটনা দেশের বিনোদন জগতেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন যে, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যেন এই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচিত হয় এবং নেপথ্যের কুশীলবরা শাস্তির মুখোমুখি হন। আদালতের এই আদেশের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন আরও গভীর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা।


