প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পাকিস্তানের জনপ্রিয় টিকটক কনটেন্ট ক্রিয়েটর শামসো বিবিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ভাইবোনদের সঙ্গে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে থাকা দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। এ ঘটনায় তার ১৫ বছর বয়সী বোন গুরুতর আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আয়েশা গিলামানা’ নামেও পরিচিত ছিলেন শামসো বিবি। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে টিকটকে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনি। প্ল্যাটফর্মটিতে তার প্রায় ১৩ লাখ অনুসারী ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিহতের বাবা ফজল সাহেবজাদা পুলিশের কাছে করা অভিযোগে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন একটি ফোন কল পাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হন তার মেয়ে। কাশিফ নামের এক ব্যক্তি ফোন করে তাকে বাইরে আসতে বলেন। ফোন পাওয়ার পর শামসো বিবি তার ১৫ বছর বয়সী বোন আসিমা এবং ভাই নেয়ামতুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে বের হন।
তারা একটি পেট্রোল পাম্পের কাছাকাছি পৌঁছালে মোটরসাইকেলে থাকা দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। আকস্মিক এ হামলায় গাড়ির ভেতর থাকা শামসো বিবি গুলিবিদ্ধ হন। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি গুলি তার ঘাড়ে লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। গুলির আঘাতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে সেটি অন্য একটি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে তার বোন আসিমা গুরুতর আহত হন।
হামলার পর ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন এবং বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের কারণ ও হামলাকারীদের শনাক্ত করার বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আর্থিক বিরোধের কথাও উঠে এসেছে। শামসো বিবির বাবা পুলিশকে জানিয়েছেন, কাউসার ও জাভেদ নামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার মেয়ের আর্থিক লেনদেন ছিল। অর্থ ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার মেয়ের বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, অর্থ ফেরতের বিষয়টি নিয়ে শামসো বিবিকে আগে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে ইসলামাবাদে ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগও করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার বাবা। এ কারণে তিনি সন্দেহ করছেন, কাউসার ও জাভেদ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকতে পারেন। অথবা তারা অন্য কাউকে ব্যবহার করে হত্যার ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
তবে পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, কারা হামলায় জড়িত এবং ঘটনার আগে শামসো বিবিকে কে বা কারা যোগাযোগ করেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে।
বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে কাশিফ নামের ওই ব্যক্তির ফোন কল পাওয়ার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে পরিবার। ফোনে তাকে কেন বাইরে আসতে বলা হয়েছিল, ওই ফোন কলের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না এবং কাশিফের সঙ্গে শামসো বিবির কী ধরনের যোগাযোগ ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা।
শামসো বিবির পরিবার জানিয়েছে, তিনি প্রায় তিন থেকে চার বছর ধরে টিকটকে ভিডিও তৈরি করছিলেন। ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। বিনোদনধর্মী বিভিন্ন ভিডিওর মাধ্যমে তিনি বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে যান। তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখে পৌঁছেছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য যেমন পরিচিতি ও কাজের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা ধরনের চাপ ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শামসো বিবির হত্যাকাণ্ডের পর তার পরিবার আর্থিক বিরোধ, হুমকি এবং ঘটনার আগে আসা ফোন কলের বিষয়গুলো সামনে আনায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
একজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরের এমন আকস্মিক মৃত্যু তার অনুসারী ও পরিচিতজনদের মধ্যেও শোকের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয় থাকা শামসো বিবির জীবন কয়েক বছরের মধ্যে যে পরিচিতি তৈরি করেছিল, তা তার মৃত্যুর ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবার এখন হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যামামলা করা হয়েছে। তদন্তকারীরা হামলার স্থান, ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অস্ত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য যাচাই করতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে যাদের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে নিহতের আর্থিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে নিহতের মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ এবং ঘটনার সময়কার অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে পাওয়া ফোন কলটির উৎস ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা গেলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেতে পারেন।
এদিকে পরিবারের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে করা আগের অভিযোগ এবং শামসো বিবির সঙ্গে তাদের আর্থিক সম্পর্কের বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। পরিবারের সন্দেহ সত্য কি না, নাকি অন্য কোনো কারণেই এই হামলা হয়েছে—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
শামসো বিবির হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একজন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল যোগাযোগের মতো একাধিক প্রশ্ন। তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে এলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা হবে এবং যারা এই হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে।


