প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের আকাশ জুড়ে এক দীপ্তিময় ও ক্ষণজন্মা নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ। ১৯৯০-এর দশকে ঢাকাই সিনেমার পর্দায় আবির্ভাব ঘটে এই যুবকের, যিনি নিজের অসামান্য ফ্যাশন সেন্স, চোখ জুড়ানো মিষ্টি হাসি, মার্জিত অভিনয় এবং রোমান্টিক ধারার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের মনে এক স্থায়ী ও অবিস্মরণীয় আসন করে নিয়েছিলেন। অল্প কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই তিনি ঢালিউডের পুরো দৃশ্যপট বদলে দিয়েছিলেন এবং তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে রাজত্ব করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং মর্মান্তিক বিষয় হলো, খ্যাতির ঠিক মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর নিজ বাসভবনে রহস্যজনকভাবে চিরতরে নিভে যায় এই তারকার জীবনপ্রদীপ। তৎকালীন সময়ে এটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর অগণিত ভক্ত, পরিবার এবং শুভানুধ্যায়ীরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে এটি কোনো সাধারণ আত্মহত্যা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ও ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলা আইনি লড়াই, পুলিশি তদন্ত, পিবিআই এবং সিআইডির হাতবদল হয়ে চলা এই মামলার রহস্য যেন কুয়াশায় ঢাকা এক উপাখ্যান, যা আজও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে জমে থাকা সেই রহস্যের বরফ গলাতে এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কুয়াশা ভেদ করে সত্যকে সামনে নিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় এবার এক নাটকীয় ও চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে সালমান শাহর মৃত্যু রহস্য। এই আলোচিত হত্যা মামলার দীর্ঘদিনের এজাহারভুক্ত চার নম্বর আসামি এবং ঢাকাই চলচ্চিত্রের পরিচিত খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গত রবিবার ভোরের দিকে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কঠোর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় আকস্মিকভাবে আটক করা হয়। বিমানবন্দর কতৃপক্ষের হাতে আটকের পর দ্রুত তাঁকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডির দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে রবিবার বিকেলেই তাঁকে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির পক্ষ থেকে আদালতে তাঁকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড অথবা তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে আটক রাখার জোরালো আবেদন জানানো হয়। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্ক শেষে বিজ্ঞ আদালত আসামি আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন, যার মাধ্যমে এই বহুল আলোচিত মামলার আইনি প্রক্রিয়ায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
আদালতের এই শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য গণমাধ্যমের সামনে উন্মোচন করেন, যা পুরো দেশের মানুষের হাড় হিম করে দেওয়ার মতো। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আদালতকে জানান যে, চিত্রনায়ক সালমান শাহর তৎকালীন স্ত্রী সামিরা হক এবং সেসময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পপতি ও বিতর্কিত চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে একটি গোপন ও অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি একপর্যায়ে সালমান শাহর গোচরীভূত হলে তাদের পরিবারে তীব্র অশান্তি ও চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই গোপন সম্পর্ক ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের প্রধান বাধা হিসেবে সালমান শাহকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনা আঁটা হয়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ঢাকাই সিনেমার পরিচিত খল অভিনেতা ও এজাহারভুক্ত আসামি আশরাফুল হক ডনের সঙ্গে তৎকালীন সময়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক চুক্তি করা হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দেওয়া বিবরণী অনুযায়ী, চিত্রনায়ক সালমান শাহকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার জন্য ডনের সঙ্গে ঠিক ১২ লাখ টাকার একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। আসামিদের এই অপকর্মের নিখুঁত বিবরণ এবং ভেতরের সমস্ত গোপন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদের দেওয়া জবানবন্দিতে। অতীতে এই মামলার দীর্ঘ তদন্ত চলাকালে রিজভী আহমেদ আদালতে এসে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছিলেন, যেখানে এই ১২ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন এবং হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট ও পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে এই জবানবন্দি এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তারা মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য ডনকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে যে, কেবল সালমান শাহকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েই এই ষড়যন্ত্রের শেষ হয়নি, বরং এর পরবর্তী অধ্যায়েও অপরাধীরা তাদের জাল বিস্তার করেছিল। সালমান শাহর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার যখন এই মৃত্যুর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করে এবং সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালায়, তখন মামলাটি ধামাচাপা দিতে এবং পরিবারকে নানামুখী চাপ প্রয়োগ করতে তৎকালীন সময়ে নানা ধরনের অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিশেষ করে আদালতের এই বিচারাধীন মামলাটি যেন কোনোভাবেই সামনে এগোতে না পারে এবং মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা যায়, সেজন্য সালমান শাহর ভাই বিল্টুকে অপহরণ করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ছক কষেছিল এই ডন এবং তার সহযোগী ডেভিড নামক আরেক ব্যক্তি। তবে অত্যন্ত সাহসিকতা ও পুলিশের তৎপরতায় সেই অপচেষ্টা ভেস্তে যায়। ওই জঘন্য অপহরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একেবারে শেষ মুহূর্তে ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে হাতেনাতে গ্রেফতার হন রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ, যা পুরো ঘটনা প্রবাহের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
আইনের দৃষ্টিতে ওই গ্রেফতারের পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং রিমান্ডের মুখোমুখি হয়ে ১৯৯৭ সালের একই বছরের ২৪ জুলাই সালমান শাহ হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় একটি বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রিজভী আহমেদ। সেই জবানবন্দিতে তিনি ডনের ভূমিকা, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা এবং সামিরার সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত রোমহর্ষক ও অন্ধকার দিকগুলো জাতির সামনে উন্মোচন করেছিলেন। এরপর থেকেই ডনসহ মামলার অন্যান্য অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে আত্মগোপনে কিংবা মামলার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। দীর্ঘ এতগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই পুরনো ফাইলগুলোর পাতা উল্টে এবং রাজসাক্ষীর জবানবন্দির সূত্র ধরে সিআইডি এখন এই আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে আসল সত্য উদঘাটনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা এই রোমান্টিক নায়কের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রধান আসামিদের একজন হিসেবে ডনের গ্রেপ্তার হওয়া এবং আদালতে ১২ লাখ টাকার চুক্তি ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নাম নতুন করে আলোচনায় আসার ঘটনাটি পুরো দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ, সালমান শাহর অগণিত ভক্ত এবং তাঁর শোকার্ত পরিবার এতদিন ধরে কেবল একটি জুডিসিয়াল তদন্ত এবং প্রকৃত সত্যের মুখ দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্র যেন অতীতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য সাধারণ নাগরিক সমাজ সবসময় সোচ্চার ছিল। আজকের এই আইনি অগ্রগতি প্রমাণ করে যে অপরাধ যতই দীর্ঘকাল লুকিয়ে রাখা হোক না কেন, সময়ের আবর্তে সত্য একদিন ঠিকই আলোর মুখ দেখে।
আদালতের এই পদক্ষেপে সালমান শাহর পরিবার ও তাঁর ভক্তদের মনে আশার নতুন আলো জ্বলে উঠেছে যে, দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত রহস্যের জাল একদিন ছিন্ন হবে এবং এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি কুশীলবকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সিআইডি এখন অত্যন্ত পেশাদারিত্ব এবং সতর্কতার সঙ্গে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চুক্তির পেছনের অন্য কোনো প্রভাবশালী কুশীলব বা নেপথ্যের নায়কদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদালতের পরবর্তী শুনানিতে এই মামলার আরও অনেক অজানা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে দেশবাসী গভীর উৎকণ্ঠা ও প্রত্যাশার সঙ্গে অপেক্ষা করছে। সালমান শাহর সুদীর্ঘ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই মামলার একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তিই আজ দেশের কোটি মানুষের একমাত্র এবং অন্তিম দাবি।


