প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর শাহপরাণ এলাকায় ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন (৬৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ বলছে, প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা এবং ওই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সন্দেহ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। এ ঘটনায় জালাল (৩৫) নামে একজনকে আটক করা হয়েছে এবং তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম। তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রযুক্তিগত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনার পর হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং এর বাইরে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার জালালের সঙ্গে রেহানা পারভীন নামের এক নারীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্ক বিয়েতে গড়ানোর কথা থাকলেও প্রায় তিন মাস ধরে দুজনের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তার মধ্যে জালালের মনে সন্দেহ তৈরি হয় যে, রেহানা হয়তো তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে ওই নারীর নিয়মিত কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টার বিষয়টি জালালের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এই সন্দেহ থেকেই শাহাব উদ্দিনকে হত্যার পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত নেয় জালাল। পরে সুযোগ বুঝে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ঘটনাটি ঘটে গত রোববার দিবাগত রাতে সিলেট নগরীর শাহপরাণ থানাধীন ইসলামাবাদ এলাকায়। নিজ বাসার কাছ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় শাহাব উদ্দিনকে উদ্ধার করেন স্বজনেরা। তাঁর ঘাড়ে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের ছোট ছেলে রেদোয়ান আহমদ জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে বাবাকে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও চিকিৎসার আগেই তিনি মারা যান। পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাটি ছিল আকস্মিক এবং গভীরভাবে শোকাবহ। কারণ, শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে কারও প্রকাশ্য বিরোধ ছিল বলে তারা জানতেন না।
শাহাব উদ্দিন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। চারখাই বাজারে তাঁর ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা ছিল। পরিবার নিয়ে তিনি শাহপরাণ এলাকার ইসলামাবাদে বসবাস করতেন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা শাহাব উদ্দিনের এক ছেলে ফ্রান্সে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ছিলেন সংসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এলাকায় উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। রাতে নিজ বাসার কাছেই একজন ব্যবসায়ীকে এভাবে হামলার শিকার হতে হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দেয়। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। বিশেষ করে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীর গতিবিধি শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রাতে শাহপরাণ মাজার এলাকা থেকে জালালকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে জালাল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে বলে এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বক্তব্যকে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে না দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা বক্তব্যের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণ পর্যালোচনা করেই হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, তদন্তের আরও কিছু বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে শাহাব উদ্দিনের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে গত বুধবার দুপুরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাদ আসর জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। প্রিয়জনের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ শাহাব উদ্দিনের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যেও নাড়া দিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট নিশ্চিতভাবে বের করে আনা। জালালের বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের মিল রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা আদালতের সামনে উপস্থাপিত হবে। বর্তমানে জালালকে ঘিরে তদন্ত এগোলেও আইনগতভাবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
শাহাব উদ্দিন হত্যার ঘটনায় প্রেমঘটিত সন্দেহের যে কারণটি সামনে এসেছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ কি না—তা এখন তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে রহস্যের একটি সম্ভাব্য দিক উন্মোচিত হলেও পুরো ঘটনার পেছনের সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। ফলে সিলেটের এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডে তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকেই এখন নজর রয়েছে।


