৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে সিলেটে চা শ্রমিকদের কর্মবিরতি

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণসহ চার দফা দাবিতে কর্মবিরতিতে নেমেছেন চা শ্রমিকরা। সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের শ্রমিকেরা বুধবার থেকে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে অনির্দিষ্টকালের এই কর্মসূচি শুরু করেছেন। বৃহস্পতিবারও সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন তারা। শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ না এলে কর্মসূচি আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

চা শ্রমিকদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন দ্রুত আয়োজন, ২০২৩ সালে প্রণীত গেজেট বাতিল এবং শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা। এসব দাবিতে প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শ্রমিকেরা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার কারণে এবার তারা সংগঠিতভাবে দাবি আদায়ের পথে নেমেছেন।

সিলেটের মালনীছড়া, লাক্কাতুরা, বুরজান, খাদিমসহ ভ্যালির বিভিন্ন চা বাগানে কর্মবিরতির প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিনের কাজের গুরুত্বপূর্ণ সময় দুই ঘণ্টা শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তবে শ্রমিকরা বলছেন, এটি তাদের পেশাগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো কর্মসূচি নয়; বরং ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য বাধ্য হয়ে নেওয়া পদক্ষেপ।

মালনীছড়া চা বাগানের শ্রমিক এবং চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অজিত রায় বাড়াইক বলেন, বর্তমানে একজন চা শ্রমিক দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরি পান। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে শ্রমিক পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

অজিত রায় বাড়াইকের ভাষ্য, চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। শুধু মজুরি বাড়ানো নয়, ভূমির অধিকার এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনসহ অন্যান্য দাবিও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

চা শ্রমিকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে ভারপ্রাপ্ত কমিটির মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের সাংগঠনিক প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন দাবি যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

বুরজান চা বাগানের শ্রমিক সাইদুল রহমান সোহেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে কমিটি পরিচালিত হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।

লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিক রঘু দাস জানান, আপাতত প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা। কিন্তু দাবি আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ না এলে কর্মসূচি আরও কঠোর হতে পারে। তার কথায়, শ্রমিকরা কাজ করতে চান এবং চা শিল্পের সঙ্গে তাদের জীবন ও জীবিকা গভীরভাবে জড়িত। তবে ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন।

শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। প্রায় এক মাস ধরে তারা চার দফা দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্ট সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন তারা। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময়সীমার বিষয়টি সামনে আসে। শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় তারা কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, শ্রমিকদের দেওয়া স্মারকলিপি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। চার দফা দাবির মধ্যে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিগগিরই নির্বাচন আয়োজন করবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এর আগে গত ১৪ আগস্ট চা শ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে তারা শ্রমিকদের অধিকার, ভূমি এবং জীবনমান উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। এ সময় মন্ত্রীর কাছে আট দফা দাবিসংবলিত একটি স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

বৈঠকে চা বাগানগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করার বিষয়ে উদ্যোগের কথা জানানো হয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হবে এবং ওই দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল।

চা শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলন শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও ভূমি-অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নও। শ্রমিকদের কাছে চা বাগান কেবল কর্মস্থল নয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব বাগানকে ঘিরেই তাদের বসতি, জীবিকা ও সামাজিক জীবন গড়ে উঠেছে। ফলে ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তাদের কাছে জীবনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিশ্চয়তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, চা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলো এই শিল্পের ঐতিহাসিক কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। বাগানগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিকদের সন্তুষ্টি ও জীবনমান উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকদের অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে তা একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে, অন্যদিকে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সম্পর্কেও চাপ তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে শ্রমিকেরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টার কর্মবিরতির মাধ্যমে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আশ্বাস এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের তদন্তের উদ্যোগের কথা জানানো হলেও মজুরি, গেজেট বাতিল ও ভূমি অধিকারের মতো অন্য দাবিগুলো নিয়ে কী ধরনের কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেদিকেই এখন নজর শ্রমিকদের।

শ্রমিকদের বক্তব্য, তারা সংঘাত চান না; বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। কিন্তু দীর্ঘদিনের দাবি যদি কেবল আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে চা বাগানের উৎপাদন ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোই এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

চা শ্রমিকদের কর্মবিরতি এরই মধ্যে সিলেটের চা বাগানগুলোতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের চার দফা দাবির বাস্তবায়ন কত দ্রুত হয় এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, তার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী কর্মসূচির ধরন। শ্রমিকদের দাবি, ন্যায্য মজুরি, সাংগঠনিক অধিকার, ভূমির নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন থামবে না।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৯/১১ হামলার বিচার শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৯/১১ হামলার বিচার শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাসসহ আসামিরা খালাস

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রেমঘটিত সন্দেহে সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন হত্যা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৪৭২ কেজি ভারতীয় ফল জব্দ, আটক ১

প্রকাশ:  ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতীয় কবি নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাগর-রুনি হত্যা: ১২৯ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের ৫ দিনের রিমান্ড

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ