প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে এক সাধারণ শিক্ষার্থীকে হয়রানি, ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বিনা অনুমতিতে তল্লাশি এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপের কথা উল্লেখ করে কলেজ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
অভিযোগকারী জুলফিকার হাসান এমসি কলেজের বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। গত ২৫ আগস্ট কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর তিনি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
জুলফিকার হাসানের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলা বিভাগের অভ্যন্তরীণ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন জোরপূর্বক পরীক্ষা করেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর অনুমতি ছাড়াই ব্যক্তিগত ফোনের বিভিন্ন বিষয় দেখার পাশাপাশি তাঁর মায়ের মোবাইল নম্বর চাওয়া হয় এবং নম্বর দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, পরিস্থিতির একপর্যায়ে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি নিজেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীন মনে করছেন বলে অধ্যক্ষের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন। একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, মোবাইল ফোন এবং পারিবারিক তথ্য তাঁর অনুমতি ছাড়া তল্লাশি বা সংগ্রহের চেষ্টা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
ঘটনার পর কলেজ প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানোর সিদ্ধান্ত নেন জুলফিকার হাসান। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী যেন কোনো ধরনের চাপ, ভয় বা হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সে কারণে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগে জুলফিকার হাসান আরও বলেন, কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন তল্লাশি করার ক্ষেত্রে তার সম্মতি ও আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও পারিবারিক যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় এমসি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে মতপার্থক্য, বিভাগীয় বা সাংগঠনিক কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলেও তা সমাধানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন। কোনো শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো, চাপ প্রয়োগ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে মোবাইল ফোন বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফোনে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ছবি, নথি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগের মতো সংবেদনশীল বিষয় থাকতে পারে। তাই কোনো শিক্ষার্থীর সম্মতি ছাড়া তার ফোন পরীক্ষা করার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে পরিবারের সদস্যের ফোন নম্বর চাওয়ার ক্ষেত্রে কী উদ্দেশ্যে তা চাওয়া হয়েছিল এবং কোনো ধরনের চাপ বা হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না, তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
জুলফিকার হাসান তাঁর অভিযোগে কলেজ প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, অভিযোগটি কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই যাচাই করা হবে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কলেজের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য কিংবা ঘটনার বিষয়ে তাঁদের পক্ষের বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ফলে অভিযোগের সব দিক যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। সংগঠনভিত্তিক মতাদর্শ বা রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ বা মতবিরোধ দেখা দিলে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন।
এমসি কলেজ সিলেটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে আসছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই দায়িত্ব। কোনো শিক্ষার্থী হয়রানি বা হুমকির অভিযোগ করলে সেটি উপেক্ষা না করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের আস্থাও বাড়বে।
জুলফিকার হাসানের লিখিত অভিযোগ এখন কলেজ প্রশাসনের কাছে রয়েছে। অভিযোগটি নিয়ে প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় কি না এবং অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কী পাওয়া যায়—তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীরা যাতে ভয়ভীতি ছাড়াই পড়াশোনা করতে পারেন, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন এবং ব্যক্তিগত জীবন ও তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এমসি কলেজের সাম্প্রতিক এই অভিযোগ তাই যথাযথ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।


