প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রকৃতির নিয়মে বছর ঘুরে আমাদের মাঝে গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ ও গরমের তীব্রতা যখন চারপাশকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন মানবজীবনের স্বস্তি রক্ষায় বিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক পাখা কিংবা এয়ার কন্ডিশনারের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু আধুনিক এই যুগে এসেও বিদ্যুৎ যেন সাধারণ মানুষের জীবনের এক অধরা ও অধরা মায়ার খেলায় পরিণত হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ও বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে গত কিছুদিন ধরে এক নজিরবিহীন ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ের মহোৎসব শুরু হয়েছে। দিনের আলো কিংবা রাতের গভীর অন্ধকার—কোনো কিছুতেই যেন আর স্বস্তি নেই। দিন-রাত সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলা এই ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ের কারণে পুরো সিলেট নগরীজুড়ে এক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা এই বিদ্যুৎ সংকট নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে একেবারে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং সাধারণ মানুষের সহ্যক্ষমতা ইতোমধ্যে তার চূড়ান্ত সীমারেখা অতিক্রম করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে অভিযোগ করে জানিয়েছেন যে, গত কয়েকদিন ধরে নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে মূল বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বা অনুমেয় নিয়ম নেই। কোনো কোনো এলাকায় অবস্থা এমন শোচনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, ঠিক এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী টানা এক বা দুই ঘণ্টা অন্ধকারেই কাটাতে হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই দিনে ও রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎহীন এই দীর্ঘ সময়গুলোতে তীব্র গরম আর ভ্যাপসা আবহাওয়ায় বিশেষ করে ঘরে থাকা কোমলমতি শিশু এবং বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। রান্নাবান্না, পড়াশোনা, গৃহস্থালী কাজ থেকে শুরু করে আধুনিক অফিস-আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম—সবকিছুতেই এই আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এক বিরাট বাধার প্রাচীর গড়ে তুলেছে। যারা ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইনে বাসা বসে বিভিন্ন কাজ করেন কিংবা শিক্ষার্থীরা যারা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাদের দুর্ভোগের যেন আর শেষ নেই।
নগরীর বাগবাড়ি এতিম স্কুল রোড এলাকার নিবাসী রাতুল নামের এক সচেতন নাগরিক অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে নিজের ভোগান্তির কথা প্রকাশ করে জানান যে, তাদের এলাকায় বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। দিনে হয়তো কদাচিৎ এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, কিন্তু তার পরের দুই ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক কতবার যে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে, তার হিসাব রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের বেলায় কাজের ব্যস্ততার মাঝেও এই লুকোচুরি খেলা চলে, আর রাতের বেলা পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। রাত দশটা, একটা কিংবা গভীর রাত দুটোর সময়ও যখন হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন ভ্যাপসা গরমে বিছানায় ঘুমানো তো দূরের কথা, টেকা দায় হয়ে পড়ে। পরদিন সকালে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে জেগে অফিস বা কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা শিশুদের স্কুল-কলেজে পাঠানো এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, বরং সিলেট নগরের বিখ্যাত বাণিজ্যিক কেন্দ্র জিন্দাবাজার এলাকার এশিয়া ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও এই লোডশেডিংয়ের কারণে সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, বাণিজ্যিক এই এলাকাগুলোতে যেন বিদ্যুতের লুকোচুরি সবচেয়ে বেশি মাত্রায় খেলা করে। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে দিনের পর দিন তাদের দোকানে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার সমাগম হচ্ছে না। কখনো এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসার পর আবার দীর্ঘ দুই বা তিন ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র গরমে অন্ধকার ও ভ্যাপসা পরিবেশে দোকানে বসে থাকা এবং ব্যবসা পরিচালনা করা এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ে তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এবং এই অবস্থার দ্রুত অবসান দাবি করছেন।
অনুরূপভাবে কেওয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন আহমদ এবং পাঠানটুলা এলাকার আল-আমিনসহ আরও অনেকেই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বিদ্যুৎ বিভাগের এক খামখেয়ালি আচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও যাচ্ছেতাই অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের জনজীবন আজ মারাত্মকভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সিলেটে বিদ্যুতের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট অবশ্য কোনো নতুন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল সরবরাহ পাওয়ার অজুহাতে এই অঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিগত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ না পাওয়ার অজুহাতে দিনে ও রাতে একাধিকবার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছিল সিলেটবাসী। এমনকি গত বছরের অক্টোবর মাসেও ঘনঘন এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকেও সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছিল, যা সেসময় নগরবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। সেই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান নিয়ামক জ্বালানি সংকট, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ প্রাপ্তি এবং দেশের কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। ফলে তখনো প্রায় এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছিল পুরো সিলেট অঞ্চল। গ্রীষ্মের সেই প্রখর রোদের দিনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি তখন জানিয়েছিল যে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। পরবর্তীতে জুন মাসেও এই সংকট সম্পূর্ণ অব্যাহত থাকে। ওই বছরের জুন মাসের একটি হিসেবে দেখা যায় যে, সিলেট অঞ্চলে কেবল সন্ধ্যা বা পিক আওয়ারেই বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ২৩২ মেগাওয়াট। অথচ এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ বা সরবরাহ পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ১৪৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ তখনো প্রতিদিন ৮৪ মেগাওয়াটের একটি বিশাল ঘাটতি নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল পুরো সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই লোডশেডিংয়ের সংস্কৃতি সর্বশেষ আগস্ট মাসে এসেও বিন্দুমাত্র কাটেনি, বরং তা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বরাবরের মতো এবারও তাদের পুরনো সেই অজুহাত সামনে নিয়ে আসছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিড থেকে সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় এখনো অত্যন্ত কম পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, যার কারণে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় বারবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন গণমাধ্যমকে জানান যে, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট বিভাগের পিডিবির আওতাধীন সমগ্র এলাকায় বিদ্যুতের মোট দৈনিক চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৩৩ মেগাওয়াট। অথচ এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১৭৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধানের কারণে পুরো বিভাগজুড়ে প্রতিদিন অন্তত ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের এক বিরাট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
আগামী দিনে এই অচলাবস্থা কাটবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও আশ্বস্ত করার মতো তথ্য দিতে পারেননি বিদ্যুৎ বিভাগের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন আরও জানান যে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই করুণ পরিস্থিতির কোনো সুনির্দিষ্ট উন্নতি হবে কি না, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে যদি জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, তবে বর্তমানের এই অসহনীয় লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি ফিরে পাবে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে ঠিক কখন বা কোন শুভলগ্নে সরবরাহ বাড়বে কিংবা এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের স্থায়ী ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ থেকে নগরবাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা আশ্বাসের বাণী শোনাতে পারেননি বিদ্যুৎ বিভাগের এই কর্মকর্তা।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা এই ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সিলেটের সাধারণ মানুষ ও নগরবাসীর অন্তরের ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমে ফ্যানের বাতাস তো দূরের কথা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সরবরাহটুকু পর্যন্ত যখন ব্যাহত হয়, তখন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ভুক্তভোগী নগরবাসীর জোরালো দাবি হলো, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ যেন অতি দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করে সিলেট অঞ্চলের এই ভঙ্গুর বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করে তোলে। অন্ততপক্ষে লোডশেডিংয়ের পূর্বনির্ধারিত কোনো শিডিউল বা অন্তত কিছুটা সময় আগে পূর্বঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে মানুষ অন্তত সেই অনুযায়ী তাদের জরুরি কাজগুলো গুছিয়ে নিতে পারে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই বিদ্যুৎ সংকটের চির অবসান ঘটুক—এটাই এখন সিলেটের কোটি মানুষের একমাত্র এবং তীব্র দাবি।


