প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা বিধানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপিতে প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়ানোর এক নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামুকে আরও বেশি শক্তিশালী, যুগোপযোগী এবং জনবান্ধব করে তোলার অংশ হিসেবে নিয়মিত কাজেরই একটি অংশ হলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও বদলি। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতজন দক্ষ অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে নতুন কর্মস্থলে রদবদল করা হয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষা এবং পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলি আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করার লক্ষ্যেই মূলত প্রশাসনিক এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।
গত সোমবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ মহোদয়ের স্বহস্তে স্বাক্ষরিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই রদবদল ও পদায়নের এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। ডিএমপির সদর দপ্তর থেকে জারি করা ওই আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নত করার স্বার্থে পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর থাকবে। রাজধানী ঢাকার অপরাধ দমন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুদায়িত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে নতুন কর্মকর্তাদের এই পদায়ন এক নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বিসিএস ব্যাচের চৌকস ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করেই এই দায়িত্বগুলো বণ্টন করা হয়েছে।
অফিস আদেশের সুনির্দিষ্ট তথ্যানুযায়ী, গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বা সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসা মো. আল আমিন হোসাইনকে রদবদল করে নতুনভাবে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বা বাড্ডা জোন হিসেবে গুলশান বিভাগেই পদায়ন করা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করা ৩০তম ব্যাচের একজন মেধাবী কর্মকর্তা। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের কাজের দক্ষতা বাড্ডা জোনের আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। অপরাধপ্রবণ এই জনপদটিতে অপরাধ দমনে তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা দারুণভাবে কাজে লাগবে।
অন্যদিকে, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড ওয়ার্কশপ বিভাগের মেইনটেন্যান্সের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এহসানুল কামরান তানভীরকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে বদলি করে ট্রাফিক-লালবাগ বিভাগে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে নতুন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ৩৫তম ব্যাচের একজন অত্যন্ত চৌকস কর্মকর্তা। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার অন্যতম হিসেবে লালবাগ জোনের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং যানজট নিরসনে তাঁর এই নতুন পদায়ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নগরীর এই অংশটিতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটাতে তাঁর এই পদায়ন ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসনের সহকারী কমিশনার বা এসি পর্যায়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে আরও বেশি গতি আসবে। ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার জিয়াউল হক শাহকে বদলি করে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের পেট্রোল বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিসিএসের ৩৭তম ব্যাচের একজন সম্ভাবনাময় কর্মকর্তা। ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি এবং নিয়মিত পেট্রোলিং কার্যক্রম জোরদার করার ক্ষেত্রে তাঁর এই নতুন দায়িত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে তিনি পুলিশ বাহিনীকে আরও বেশি সক্রিয় করে তুলতে পারবেন বলে বিশ্বাস করেন সংশ্লিষ্টরা।
একই আদেশে সহকারী পুলিশ কমিশনার রাকিবুল হাসান সাকিবকে উত্তরা বিভাগের উত্তরা-পূর্ব জোনের পেট্রোল বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে নতুনভাবে পদায়ন করা হয়েছে। তিনি বিসিএসের ৪১তম ব্যাচের একজন তরুণ ও উদ্যমী কর্মকর্তা। বিমানবন্দর ও উত্তরার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারের নিরাপত্তা রক্ষা ও ট্রাফিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে তরুণ এই কর্মকর্তার দীর্ঘমেয়াদী কর্মতৎপরতা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। অন্যদিকে, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-উত্তর বিভাগে ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন শাখায় সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. সাইফুল্লাহকে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধের মাত্রা যেভাবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এই বিশেষায়িত শাখায় তাঁর এই পদায়ন অপরাধ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
তালিকায় থাকা উত্তরা বিভাগের উত্তরা-পূর্ব জোনের পেট্রোল দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. হাবিবুর রহমানকে বদলি করে অপারেশনস বিভাগের ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার-৩ শাখায় নতুন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপারেশনের বিভিন্ন কৌশল নির্ধারণে এই কমান্ড সেন্টারের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। এ ছাড়া পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বা পিওএম বিভাগের পূর্ব জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শাহিবুল ইসলামকে লজিস্টিকস বিভাগের অস্ত্রাগার শাখায় সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। লজিস্টিকস ও অস্ত্রাগার পরিচালনার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দায়িত্বশীল পদে তাঁর এই সংযুক্তি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
এদিকে এই সাম্প্রতিক রদবদল ও বদলির আদেশের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর কথাও অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট তারিখের একটি পূর্ববর্তী অফিস আদেশের মাধ্যমে মো. তানিয়া সুলতানাকে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগে বদলি করার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, প্রশাসনিক কারণ বশত সেই পূর্ববর্তী আদেশটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী মহলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নমনীয়তা ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। ডিএমপির এই ধরনের রদবদল এবং প্রশাসনিক সংস্কার নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য হলো নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পুলিশ প্রশাসনের এই পরিবর্তন ও নতুন পদায়নগুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নগরবাসীর একটি বড় অংশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, সঠিক জায়গায় সঠিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব অর্পণ করার মাধ্যমেই কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। বিশেষ করে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সাইবার অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জোনভিত্তিক অপরাধ দমনে এই নতুন মুখগুলো তাদের মেধা ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখবে বলে সবাই আশা করছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এই চৌকস কর্মকর্তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করে রাজধানীবাসীর আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবেন এবং একটি নিরাপদ ও শান্তিময় ঢাকা গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখবেন—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।


