প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলো যেন বর্তমানে প্রতিদিন এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভোরের আলো ফোটার আগেই ঝরে পড়ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে প্রিয়জনের সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কপালে হঠাৎ করেই নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। সড়ক দুর্ঘটনার এই অন্তহীন মিছিল যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই ভেসে আসে কোনো না কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর, যা গোটা জাতির বিবেককে বারবার নাড়া দিয়ে যায়। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের ব্যস্ততম যোগাযোগ পথগুলোতে যেভাবে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সম্প্রতি এমনই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ঐতিহাসিক লালাবাজার এলাকা, যেখানে একটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও দ্রুতগামী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক তরতাজা প্রাণ চিরতরে নিভে গেছে এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন নিরপরাধ মানুষ।
ঘটনাটি ঘটেছে চলতি সপ্তাহের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এক ভোরে, যখন চারপাশের প্রকৃতি সবেমাত্র ঘুমের রেশ কাটিয়ে জেগে উঠছে। সোমবার ভোরের প্রথম আলো ফোটার ঠিক আগে, ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ঠিক পাঁচটা বাজছে, সিলেট-ঢাকা বা সংলগ্ন আঞ্চলিক মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার এলাকার কুশিয়ারা পেট্রোল পাম্পের ঠিক সামনে ঘটে যায় এই সর্বনাশা দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সে সময় ঢাকা বা অন্য কোনো দূরপাল্লার দিক থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসা সিলেটগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা একটি ভারী মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুটি ভারী যানের এই সংঘর্ষের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে বাস ও ট্রাকটির সামনের অংশ সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে যায়। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের চিৎকারে এবং আকস্মিক এই ভয়াবহতায় চারদিকে এক চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, যা উপস্থিত লোকজনের হৃদয়ে গভীর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
এই আকস্মিক ও শক্তিশালী মুখোমুখি সংঘর্ষের পরিণতিতে ঘটনাস্থলেই করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাসের সঙ্গে থাকা এক তরুণ কর্মী। স্থানীয় সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে, নিহত ওই দুর্ভাগ্যবান ব্যক্তি পেশায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীবাহী বাসটির একজন হেলপার বা সহকারী ছিলেন। কাজের তাগিদে ও পেটের টানে প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি বাসে ডিউটি করছিলেন, অথচ কে জানত যে এই ভোরের সূর্য তাঁর জীবনের শেষ সূর্য হয়ে দেখা দেবে। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় কেবল ওই হেলপারই প্রাণ হারাননি, বরং বাস ও ট্রাকে থাকা আরও অন্তত পাঁচজন সাধারণ যাত্রী ও চালকের সহকারী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের তীব্রতার কারণে বাসটির ভেতরে আটকা পড়ে তারা মারাত্মক জখম হন। মুহূর্তের মধ্যে ভোরের শান্ত পরিবেশ নিমিষেই পরিণত হয় এক রক্তিম আর্তনাদে, যা আশপাশের মানুষের মনে গভীর শোক ও অনুকম্পার জন্ম দিয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় সাহসী মানুষ ও পথচারীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং উদ্ধারকাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ভেতরে আটকে থাকা আহত যাত্রীদের একে একে বাইরে বের করে আনেন এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যেই খবর পেয়ে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাকটিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়ে মহাসড়কে সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়া যান চলাচল স্বাভাবিক করার কাজ শুরু হয়। উদ্ধারকৃত গুরুতর আহত পাঁচজন যাত্রীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বর্তমানে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁদের জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। তবে আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দক্ষিণ সুরমা থানার সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. আশরাফুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান যে, এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই বাসের হেলপার নিহত হয়েছেন। নিহত ওই যুবকের সঠিক পরিচয় বা নাম-ঠিকানা তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও পুলিশ তা উদ্ঘাটনের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে নিহত ওই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে। পাশাপাশি এই বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোন কারণগুলো দায়ী ছিল এবং আইনগতভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন মহাসড়কে এই ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যা সচেতন মহলে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চালকদের বেপরোয়া গতি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ট্রাফিক আইনের প্রতি চরম অবহেলা এবং ক্লান্তি মাথায় নিয়ে দীর্ঘ পথ গাড়ি চালানোর মতো বিষয়গুলো এই দুর্ঘটনাগুলোকে ডেকে আনছে। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ, অপরিকল্পিত গতিরোধক এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বা সম্ভাবনাময় কোনো তরুণের এমন অকালমৃত্যু কেবল একটি পরিবারের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং তা আমাদের সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ মানুষের এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে হলে কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মহাসড়কগুলোর আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।


