প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সবসময়ই আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো নিকটতম প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ এবং নাড়ির টান। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ বা টার্নিং পয়েন্ট পার হচ্ছে। ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর ও সম্ভাবনাময় মুহূর্তে বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী মহলে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক দুই মাস পর তিনি সরাসরি বাংলাদেশের মান্যবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
গত সোমবার সকাল এগারোটার দিকে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওস্থ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় বা সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব দপ্তরে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই হাইপ্রোফাইল সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের অত্যন্ত দায়িত্বশীল সূত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি গণমাধ্যমকে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, এটি মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও এর পরিধি ও তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ গলাতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক ক্ষেত্রগুলোকে আরও বেশি গতিশীল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে এই বৈঠকটি এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বৈঠকে কেবল চিরাচরিত কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা হয়নি, বরং দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও আন্তরিক আলোচনা হয়েছে, যা উভয় দেশের নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ, দেশটির সাবেক রেলমন্ত্রী এবং অভিজ্ঞ ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতা দিনেশ ত্রিবেদীকে সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমকক্ষ মর্যাদার বিশেষ পদমর্যাদা প্রদান করে দিল্লির পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কূটনৈতিক দায়িত্বে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। গত ১২ জুন অত্যন্ত উৎসাহ ও প্রত্যাশার এক নতুন আবহ তৈরি করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মেরামতের সেই বিশেষ সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এসে পৌঁছান দিনেশ ত্রিবেদী। এরপর গত ২৫ জুন তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের পরিচয়পত্র পেশ করার মধ্য দিয়ে ঢাকায় ভারতীয় মিশনের প্রধান হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই তাঁর অতি সক্রিয় কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার বিভিন্ন উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
পরিচয়পত্র পেশ করার ঠিক পরপরই অত্যন্ত নাটকীয় ও যুগান্তকারী এক পদক্ষেপে ঢাকার ব্যস্ততম যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত বিশাল ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বা আইভ্যাক আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছিলেন এই নতুন হাইকমিশনার। বিগত প্রায় দুই বছর ধরে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় বন্ধ থাকা বহুল কাঙ্ক্ষিত ও জনগুরুত্বপূর্ণ পর্যটন বা ট্যুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু করার ঐতিহাসিক ঘোষণা তিনি সেদিনই প্রদান করেছিলেন, যা বাংলাদেশর ভ্রমণপিপুসু ও সাধারণ মানুষের মনে দারুণ স্বস্তি এনে দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৯ জুলাই তিনি বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ পৃথক বৈঠকে মিলিত হয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে দুই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে তিস্তা ও গঙ্গার মতো জটিল পানিবণ্টন চুক্তিগুলোর সুরাহা করার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। সেসময় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সদিচ্ছা এবং আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে এমন কোনো জটিল সমস্যা নেই যার সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব নয়।
সোমবারের এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের সময় দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের সেতুবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এই দুই অভিজ্ঞ কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যের প্রসার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা, সীমান্ত হত্যা বন্ধকরণ, ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি পারস্পরিক আস্থার এই ধারা অব্যাহত রাখেন, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে এক অভাবনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি নতুন ও সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও অত্যন্ত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন হেভিওয়েট নেতাকে বিশেষ মর্যাদায় ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের ভুল বোঝাবুঝিগুলো দ্রুত দূর করে একটি শক্তিশালী ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। দুই দেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং যৌথ নিরাপত্তার স্বার্থে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আগামী দিনে আরও বেশি সুদৃঢ় ও পরিপক্ব হয়ে উঠবে—এটাই এখন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিকামী মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।


