প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ধাপ। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, বছরের পর বছর ধরে চলা প্রস্তুতি এবং রঙিন স্বপ্নের এক বিশাল যজ্ঞের পর যখন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, তখন সব শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা এক বিন্দুতে মিলে যায় না। চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এবং সমমান পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে দেশজুড়ে নানা আলোচনা ও পর্যালোচনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই পুরো শিক্ষাঙ্গনে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে আনন্দ ও উল্লাসের ফোয়ারা ছুটছে সেই সব কৃতী শিক্ষার্থীদের ঘরে, যারা শত প্রতিকূলতা পেরিয়েও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন; অন্যদিকে ফলাফলের সার্বিক চিত্রে নেমে এসেছে এক গভীর উৎকণ্ঠা ও চিন্তার ছায়া।
সোমবার সকাল ঠিক দশটায় সিলেট শিক্ষাবোর্ডের ঐতিহ্যবাহী সম্মেলন কক্ষে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি বছরের এই মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের সম্মানিত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াসমিন। উৎসবমুখর কিংবা কেবল আনুষ্ঠানিকতার আবহে নয়, বরং বেশ কিছু হতাশার পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে সিলেট বোর্ডের ফলাফল দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। বোর্ডে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যখন একে একে পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানগুলো তুলে ধরছিলেন, তখন শিক্ষা খাতের সঙ্গে জড়িত সচেতন মহল ও অভিভাবকদের কপালে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। কারণ বছরের পর বছর ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় নানা সংস্কারের কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলের ফলাফল যেন এক পুরোনো স্থবিরতার বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছে।
চলতি বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুপরিসর গণ্ডি থেকে মোট ৮৯ হাজার ৪২১ জন পরীক্ষার্থী অত্যন্ত উদ্দীপনার সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার দীর্ঘ বৈতরণী পার হয়ে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন মাত্র ৫১ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থী। বোর্ডের প্রকাশিত এই সার্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষার অংশ নেওয়া বিশাল এক শিক্ষার্থীর দল তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, যা কেবল সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্যই নয়, বরং পুরো আঞ্চলিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে বড় ধরনের এক প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। পাসের এই নিম্নমুখী হার প্রমাণ করে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আরও গভীর তদারকি প্রয়োজন।
তবে সামগ্রিক পাসের হার হতাশাজনক হলেও এর মধ্যেও আশার আলো জ্বেলেছে কৃতি শিক্ষার্থীরা, যারা সর্বোচ্চ সাফল্যের শিখর জিপিএ-৫ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। চলতি বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৩ হাজার ৮৩৬ জন মেধাবী শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, সামগ্রিক পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জনের এই গৌরবময় লড়াইয়ে ছাত্রসমাজকে পেছনে ফেলে দৃশ্যত বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে রয়েছে আমাদের ছাত্রীরা। নারী শিক্ষার অগ্রগতি এবং ছাত্রীদের নিরলস অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে এই সাফল্য শিক্ষার আলো প্রসারে এক ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এ ছাড়া একটি দারুণ ইতিবাচক দিক হলো, বোর্ডের অধীনে থাকা শত শত প্রতিষ্ঠানের ভিড়ে এবার ঠিক ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে।
গত বছরের একই সময়ের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের চিত্রটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো থাকলেও এবার তা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। গত বছর বোর্ডের সার্বিক পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যার সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরে পাসের হার এক ধাক্কায় কমে গেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। এত বড় ব্যবধানে পাসের হার কমে যাওয়ার এই ঘটনাটি শিক্ষাবিদদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে একটি জায়গায় সামান্য স্বস্তি মিলেছে, আর তা হলো জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা। গত বছর যেখানে সমগ্র বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৩ হাজার ৬১৪ জন শিক্ষার্থী, সেখানে চলতি বছর সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জনে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২২ জন বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা চার জেলার ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার মানের এক বৈচিত্র্যময় চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। জেলাভিত্তিক এই প্রতিযোগিতায় পাসের হারের দিক থেকে অন্য সব জেলাকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জ জেলা। অন্যদিকে সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ-৫ অর্জনের গৌরবের অধিকারী হয়েছে চা বাগান ঘেরা মৌলভীবাজার জেলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী সিলেট জেলায়। এই একক জেলায় মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার ৩৩১ জন, যার মধ্যে ছাত্র ছিল ১৪ হাজার ৩২১ জন এবং ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ১০ জন। সিলেট জেলার মোট ৩৬৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সুবিধার জন্য মোট ৯৪টি স্বতন্ত্র কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলায় চলতি বছর পরীক্ষার্থীর মোট সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৯১৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৭ হাজার ৬৩১ জন এবং ছাত্রী ছিল ১২ হাজার ২৮২ জন। জেলার মোট ১৯৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে ৩৭টি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন। সুনামগঞ্জ জেলায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৩৮৩ জন, যেখানে ছাত্র ছিল ৭ হাজার ৫১৫ জন এবং ছাত্রী ১০ হাজার ৮৬৮ জন। এই হাওর অঞ্চলের ২৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৪৫টি কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর হবিগঞ্জ জেলায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ হাজার ৭৯৪ জন, যার মধ্যে ছাত্র ৬ হাজার ৬৩ জন এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৭৩১ জন। হবিগঞ্জের ১৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মোট ৪৯টি কেন্দ্রে তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
বিগত বছরগুলোর ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে fluctuating বা ওঠানামা করেছে। বিগত ২০২৪ সালে এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অথচ তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পাসের হার হঠাৎ করেই কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশে। সেই ধারা বজায় রেখে চলতি ২০২৬ সালের ফলাফলে পাসের হার আরও কমে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছর পাসের হার আরও ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে বিগত বছরগুলোতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গেছে। অতীতে যখন এক বছরে ৫ হাজার ৪৭১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল, তখন পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ৩ হাজার ৬১৪ জনে নেমে এসেছিল।
পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও পাসের প্রকৃত চিত্রের পাশাপাশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিশাল সংখ্যাটি প্রতিবারই সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। গত বছর এই বোর্ডে মোট ১ লাখ ২ হাজার ২১৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে পাস করেছিল ৭০ হাজার ৯১ জন। অন্যদিকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেবার ঠিক ৩২ হাজার ১২৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছিল, যা শতকরা হিসেবে ছিল ৩১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। চলতি বছরেও পাসের হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা যে এক বিরাট অংকে গিয়ে ঠেকেছে, তা সহজেই অনুমেয়। দিনের পর দিন পড়াশোনা করেও যখন হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থী তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হয়ে থাকে না, বরং তা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটির এক বড় দলিল হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিলেটে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে বহুমুখী কারণ লুকিয়ে রয়েছে। করোনাকালীন সময়ের লার্নিং লস বা শিক্ষণ ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষকের তীব্র সংকট, দুর্বল পাঠদান পদ্ধতি এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব এই ফলাফলের জন্য অনেকাংশেই দায়ী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো কঠিন বিষয়গুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব থাকায় শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ে। অথচ শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্তিশালী করার একমাত্র হাতিয়ার হলো মানসম্মত শিক্ষা। তাই সিলেট অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার এই বেহাল দশা দূর করতে হলে কেবল ফলাফল প্রকাশের দিন হতাশা প্রকাশ করলেই চলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।


