এশিয়া থেকে সরছে না যুক্তরাষ্ট্র, আরও শক্ত অবস্থানে পেন্টাগন

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল ও বহুমাত্রিক সমীকরণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক শক্তির লড়াইয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে উদীয়মান নতুন পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এই রুদ্ধদ্বার খেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা প্রায়শই ঘুরপাক খায়। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আমেরিকা কি তবে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই এশিয়া মহাদেশ থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে? ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মনে যখন নানা ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগের মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সেই সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটানো হয়েছে। বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে পেন্টাগন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া মহাদেশ বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে কোনোভাবেই সরে যাচ্ছে না, বরং এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ নিজেদের অনুকূলে ধরে রাখতে তারা আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুদৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখছে।
গত সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগনের একজন অত্যন্ত ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালী নীতি নির্ধারক কর্মকর্তা ম্যানিলার এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ থেকে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল ও নিরাপত্তা নীতির ওপর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর আস্থার সংকট বা নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা বিশ্লেষণ চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের নীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অটুট আগ্রহ, অঙ্গীকার ও দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর বিচারে এশিয়া অঞ্চল আমেরিকার কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি ক্ষেত্র এবং এই ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে একই সঙ্গে তিনি মিত্র রাষ্ট্রগুলোর উদ্দেশে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে বলেন যে, আমেরিকার এই সামরিক উপস্থিতির অর্থ এই নয় যে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাবে। বরং সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত অন্ধ নির্ভরতা নয়, বরং পারস্পরিক অংশীদারি ও সমকক্ষ সহযোগিতা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফরের অংশ হিসেবে বর্তমানে ফিলিপাইন সফর করছেন মার্কিন নীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি। উল্লেখ্য যে, এশিয়া মহাদেশের বুকে ফিলিপাইন হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অন্যতম বিশ্বস্ত চুক্তিভিত্তিক মিত্র রাষ্ট্র। তাই নিজের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রথম গন্তব্য হিসেবে ম্যানিলাকে বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কৌশলগত তাৎপর্য রয়েছে। ফিলিপাইনের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেওয়া তাঁর এই যুগান্তকারী বক্তব্যে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে একচুলও সরে যাচ্ছে না এবং আমরা কোথাও চলে যাচ্ছি না। বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের যেখানে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেখানেই ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে বা অনুকূলে শক্তভাবে বজায় রাখতে মার্কিন প্রশাসন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে চলেছে। তাঁর এই ঘোষণায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা কূটনৈতিক ধোঁয়াশা অনেকটা দূর হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
ফিলিপাইনের পর এলব্রিজ কোলবির এই কূটনৈতিক ও কৌশলগত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। এ অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা স্থাপত্যকে আরও বেশি শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে কোলবি বলেন যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষমতার কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে সুরক্ষিত রাখতে হলে প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল বা ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন এলাকায় প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ স্তরে শক্তিশালী করে তোলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জরুরি পূর্বশর্ত। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল বলতে মূলত জাপান থেকে শুরু করে তাইওয়ান, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বোর্নিও দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এক সামুদ্রিক ও ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলকে বোঝানো হয়ে থাকে। আর এই দীর্ঘ অঞ্চলের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসন রুখে দিতে এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি দিন দিন আরও বেশি বাড়ানো হচ্ছে বলে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সামরিক উপস্থিতি ও সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এলব্রিজ কোলবি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন যে, এই বিশাল কৌশলগত প্রতিরোধ কৌশল কেবল এককভাবে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা কখনোই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন যৌথ প্রচেষ্টা এবং অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ ও সচেষ্ট ভূমিকা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের এশীয় মিত্র ও অংশীদার রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আরও বেশি সক্রিয় হতে, সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের বাজেট ও বিনিয়োগ বাড়াতে এবং নিজেদের সার্বভৌম নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে আহ্বান জানায়, তখন এর সরল অর্থ এই নয় যে আমেরিকা তাদের চিরতরে ছেড়ে চলে যাচ্ছে বা তাদের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। বরং ওয়াশিংটন এমন সব শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল অংশীদার চায়, যারা যেকোনো বিপদের দিনে নিজেদের দেশের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব নিজেরা অত্যন্ত সফলভাবে সামলাতে সক্ষম হয়।
মার্কিন এই ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে আরও যোগ করেন যে, অংশীদার রাষ্ট্রগুলো ভেতর থেকে যত বেশি শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে, সামগ্রিক অঞ্চলের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ততটাই বেশি দুর্ভেদ্য ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অর্থাৎ অন্যের আশ্রয়ে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জনই হলো প্রকৃত বন্ধুত্বের পূর্বশর্ত। বিগত বেশ কিছুদিন ধরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র যে দীর্ঘমেয়াদি ছক কষছে, কোলবির এই বক্তব্য তারই একটি সুষ্পষ্ট প্রতিফলন। একদিকে এশিয়া ছেড়ে না যাওয়ার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান—এই দুইয়ের সমন্বয়ে মার্কিন প্রশাসন তাদের নতুন ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে। আগামী দিনে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কতটা গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন গ্রেফতার ও নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের গোয়েন্দা প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোবিন্দর আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনের অজানা গল্প

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

লালাবাজারে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

বিষয়বস্তু

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডন গ্রেফতার ও নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের গোয়েন্দা প্রধান পরাগ জৈন ঢাকায়

প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোবিন্দর আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনের অজানা গল্প

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

লালাবাজারে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

প্রকাশ:১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সিলেট-ঢাকা রুটে আকাশছোঁয়া বিমানভাড়া নিয়ন্ত্রণ জরুরি

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ডিএমপিতে রদবদল, ৭ এডিসি ও এসি পদে নতুন দায়িত্ব

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তি, বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ