প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পারস্পরিক সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক, মানুষের যাতায়াত এবং সাংস্কৃতিক ও আত্মিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়া সবসময়ই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা বা ভ্রমণসহ নানা প্রয়োজনে প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক ভারতের ভিসা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় ভিসা প্রাপ্তি রোগীদের জন্য জীবন-মৃত্যুর মতো জরুরি এক বিষয়ে রূপ নেয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভিসা আবেদনের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট পাওয়ার জটিলতা, দীর্ঘ অপেক্ষার পালা এবং আকস্মিক স্লট খোলার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় ধরনের মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবেদনকারীদের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও চরম দুর্ভোগ লাঘব করতে এবার এক যুগান্তকারী ও স্বস্তিদায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন, যা ভিসা প্রত্যাশীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গত রবিবার দুপুরে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের মান্যবর হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নিজেই এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং ভিসা সেবাকে আরও বেশি সহজলভ্য করতে হাইকমিশন সবসময়ই আন্তরিকভাবে সচেষ্ট রয়েছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ভিসা আবেদনকারীদের কল্যাণে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন, ভারতীয় মিশন সবসময় সেই পদক্ষেপই গ্রহণ করবে। সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসনে ভারতীয় হাইকমিশনের এই সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসার সৃষ্টি করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার মৈত্রীর বন্ধনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।
ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করার এই ধারাবাহিক উদ্যোগে এর আগেও কিছু পরিবর্তন এনেছিল ভারতীয় হাইকমিশন, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। পূর্বে ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লটগুলো প্রতিদিন নিয়মিতভাবে খোলা হতো, যার ফলে সাধারণ আবেদনকারী ও বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগীরা চরম অনিশ্চয়তা ও জটিলতার মুখোমুখি হতেন। রোগীর স্বজনদের প্রতিদিন সকাল বা দুপুরের নির্দিষ্ট সময়ে কম্পিউটারের সামনে অধীর আগ্রহে বসে থাকতে হতো এবং অনেক সময় স্লট না পেয়ে তারা চরম হতাশার শিকার হতেন। সেই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে ভারতীয় হাইকমিশন ইতিপূর্বে দৈনিক স্লট খোলার প্রচলিত নিয়ম পরিবর্তন করে সেটিকে এক সপ্তাহের বা সাত দিনের স্লট একসঙ্গে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নিজেই জানান যে, এক সপ্তাহের স্লট একসঙ্গে ছাড়ার সেই পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা তাদের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক ছিল, যা তাদের পরবর্তী বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে।
পূর্ববর্তী সপ্তাহের সেই সফল অভিজ্ঞতার পর এবার ভিসা প্রত্যাশীদের সুবিধার্থে সেই ব্যবস্থার পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনের নীতিনির্ধারকরা। এখন থেকে প্রতিদিন বা এক সপ্তাহ ধরে স্লট না ছেড়ে একসঙ্গে সরাসরি পনেরো দিনের বা ১৫ দিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট উন্মুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াল এখন থেকে ভিসা প্রার্থীরা একসঙ্গে আড়াই সপ্তাহের একটি দীর্ঘ সময়ের স্লট পাওয়ার সুযোগ পাবেন, যা তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা কিংবা চিকিৎসার প্রস্তুতি নিতে যথেষ্ট সহায়তা করবে। বিশেষ করে যেসব রোগী জরুরি চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তারা এখন আরও বেশি নিশ্চিতভাবে ও দীর্ঘ মেয়াদের একটি উইন্ডো সামনে রেখে তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং সম্পন্ন করতে পারবেন। এই যুগান্তকারী পরিবর্তনটি ভিসা প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতীয় হাইকমিশনের এই নতুন সিদ্ধান্তের মূল ও সর্বপ্রধান লক্ষ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তাদের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাধারণ মানুষ। ভিসার জন্য আবেদনকারী প্রতিটি নাগরিক যাতে ন্যূনতম কোনো ধরনের হয়রানি বা সমস্যার মুখোমুখি না হন, সেটাই তাদের কাজের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। bureaucratic জটিলতা বা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে কীভাবে সেবাকে আরও বেশি জনবান্ধব করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই এই ১৫ দিনের স্লট ছাড়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। প্রতিদিনের স্লট নিয়ে তৈরি হওয়া হুড়োহুড়ি এবং সাইবার জালিয়াতি বা দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য রুখতেও এই দীর্ঘমেয়াদী স্লট পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের এই সদিচ্ছা দুই দেশের জনগণের মধ্যকার বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনকে আরও বেশি মজবুত করবে।
সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং নিয়মকানুনগুলোও অত্যন্ত স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, সপ্তাহের নির্দিষ্ট কর্মদিবসে এই বুকিং প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকে। রবিবারের প্রথম কার্যদিবস থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর বারোটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এই অনলাইন বুকিং পোর্টাল খোলা থাকে। এছাড়া সপ্তাহের শেষভাগে অতিরিক্ত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শনিবারও সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত এই বুকিং কার্যক্রম সচল রাখা হয়। ভিসা প্রত্যাশীরা যেন এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং কোনো ধরনের ভুলত্রুটি ছাড়াই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে স্লট বুকিং সম্পন্ন করতে পারেন, সে বিষয়ে হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বারবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট সংক্রান্ত এই নতুন ১৫ দিনের সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি গতিশীল ও সুশৃঙ্খল করে তুলবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ থেকে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। বিশেষ করে চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে ভারত ভ্রমণকারী রোগীরা এখন অনেক বেশি মানসিক শান্তি ও নিশ্চিত থাকতে পারবেন। দুই দেশের কূটনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনকল্যাণমুখী এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপের হাত ধরে আগামী দিনে ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও বেশি স্বচ্ছ, সহজ এবং জনবান্ধব হয়ে উঠবে বলে সমগ্র সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করছে।


