প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রবাস জীবন মানেই হাজারো স্বপ্ন আর বুকভরা আশা নিয়ে কঠোর সংগ্রামের এক অন্তহীন উপাখ্যান। দেশের মাটি ও আপনজনদের মায়া ত্যাগ করে পেটের টানে, পরিবারের মুখে এক মুঠো হাসি ফোটানোর তীব্র আকুতি নিয়ে তরতাজা যুবকরা যখন সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ভিনদেশে পাড়ি জমান, তখন তাদের একমাত্র সম্বল থাকে কাজের প্রতি বুকভরা ভরসা ও সততা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অনেক সময়ই এই সোনালী স্বপ্নগুলো নিমেষেই ছাই হয়ে যায় এক পলকের দুর্ঘটনায়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির দেশ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি সোফা কারখানায় ঘটে যাওয়া এমনই এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা গোটা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। জীবিকার অন্বেষণে প্রবাসে যাওয়া নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজন তরুণ তাজা প্রাণের এমন আকস্মিক ও করুণ প্রয়াণে দেশের মানুষের বুকফাটা কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত রবিবার, যা বাংলাদেশি সময় অনুযায়ী আনুমানিক বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের নিকটবর্তী খোরদাম শহরের একটি সোফা কারখানায় সংঘটিত হয়। কারখানার ভেতর কর্মরত শ্রমিকরা যখন তাদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় মগ্ন ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই আকস্মিকভাবে আগুন লেগে যায়। কারখানার ভেতরে বিপুল পরিমাণে ফোম, কাঠ, কাপড় এবং দাহ্য পদার্থ বা কেমিক্যাল মজুত থাকায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে ভয়ানক ও ভয়াল রূপ ধারণ করে। নিমেষেই সেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো কারখানার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিকদের বের হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়। মুহূর্তের ব্যবধানে নরককুণ্ডে পরিণত হওয়া ওই কারখানার ভেতরে আটকা পড়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির, যা প্রবাসের মাটিতে দেশের মানুষের জন্য এক গভীর ও অপূরণীয় শোকের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে।
নিহত হওয়া এই সৌভাগ্যহত মানুষগুলোর প্রায় সবাই ছিলেন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার খ্যাত নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান। দেশের কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অভাবের তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং ওই সোফা কারখানায় অত্যন্ত পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করতেন। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তারা যে অর্থ উপার্জন করতেন, তা দিয়েই চলত তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও কোমলমতি শিশুদের সংসার। প্রবাসের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন তারা বুনছিলেন, তা মুহূর্তের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে গেল এই লেলিহান আগুনের গ্রাসে। রবিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে আত্রাই উপজেলার সুযোগ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও মো. মনিরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে এই ৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে নিশ্চিত করেন, যার পর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে আসে।
স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে জানা গেছে, মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের বাড়ি আত্রাই উপজেলার কয়েকটি নির্দিষ্ট গ্রামে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এর মধ্যে শুধু উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রাম থেকেই চারজন সম্ভাবনাময় তরুণের প্রাণ ঝরে গেছে। এ ছাড়া বিষা গ্রাম থেকে নিভে গেছে আরও দুজন প্রবাসীর জীবনপ্রদীপ এবং পারকাসুন্দা গ্রাম থেকে হারিয়ে গেছে আরও একজনের তাজা প্রাণ। একে একে এই সাতটি তাজা প্রাণের চিরবিদায়ের খবর যখন তাদের নিজ নিজ গ্রামে এসে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয়জন হারানোর শোকে মা-বাবা এবং স্ত্রী-সন্তানদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। যে বাড়িতে একসময় প্রবাসীর পাঠানো চিঠির বা টাকার অপেক্ষায় আনন্দের আমেজ থাকত, আজ সেই বাড়িগুলোতে শুধু স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর বুকফাটা কান্নার রোল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
তবে এই ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কোথাও কোথাও দাবি করা হয় যে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পনেরো জন, কোথাও আবার ১৭ জন কিংবা ১৯ জন প্রবাসী বাংলাদেশি আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ধরনের অতিরঞ্জিত ও যাচাই না করা তথ্যের কারণে নিহতদের পরিবার এবং দেশবাসীর মনে তীব্র ধোঁয়াশা ও চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তবে সরকারিভাবে আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্র এবং স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে, এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আত্রাইয়ের ৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করা গেছে। যদিও কারখানার অভ্যন্তরে দুর্ঘটনার ব্যাপকতা ও তীব্রতা বিবেচনা করে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, উদ্ধার কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রবাসের মাটিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। বহু কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা কিংবা কঠোর নিরাপত্তা বিধিমালা না মানার খেসারত প্রায়ই এভাবেই জীবন দিয়ে চুকাতে হয় প্রবাসীদের। নওগাঁর আত্রাইয়ের এই সাত তরুনের অকালমৃত্যু কেবল তাদের নিজ পরিবারকেই নিঃস্ব করে দেয়নি, বরং পুরো জাতিকে শোকাস্তব্ধ করে তুলেছে। দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান অতুলনীয় হলেও তাদের এমন করুণ পরিণতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবষ্টাকে চরমভাবে নাড়া দেয়। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায় এবং রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এই হতভাগ্য প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সব ধরনের ব্যবস্থা করবে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের এই অসহনীয় বেদনা কিছুটা হলেও লাঘব করবে।


