প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র সাগরদিঘীরপাড় ওয়াকওয়ে আবারও নিরাপত্তা শঙ্কার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সেখানে এক দম্পতিকে ঘিরে উত্যক্ত ও ছিনতাইয়ের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। তাৎক্ষণিকভাবে টহল পুলিশের তৎপরতায় তিনজনকে আটক করা হলেও এ ধরনের পুনরাবৃত্ত ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে একই স্থানে একাধিক ঘটনার সূত্রে জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে অর্প রায় ও তার স্ত্রী পলি রাণী সূত্রধর ওই ওয়াকওয়েতে বসে সময় কাটাচ্ছিলেন। দিনভর কর্মব্যস্ততার পর অনেকের মতো তারাও কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটানোর আশায় সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু শান্ত সেই পরিবেশ আচমকাই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, যখন কয়েকজন যুবক তাদের ঘিরে ধরে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই যুবকরা প্রথমে দম্পতির সম্পর্ক নিয়েই প্রশ্ন তোলে এবং নিজেদের পরিচয় দিতে চাপ সৃষ্টি করে। স্বামী-স্ত্রী পরিচয় অস্বীকার করে তারা নানা রকম অশোভন মন্তব্য করতে থাকে, যা পরিস্থিতিকে দ্রুত উত্তপ্ত করে তোলে। একপর্যায়ে কথার লড়াই রূপ নেয় ভয়ভীতি প্রদর্শনে, এবং তারা দম্পতির কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ঘটনার এই পর্যায়ে সৌভাগ্যক্রমে টহলরত পুলিশের উপস্থিতি পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। তবে প্রস্তুত অবস্থায় থাকা টহল টিম ঘটনাস্থলেই তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। তাদের সঙ্গে থাকা একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়, যা তাদের চলাচল ও অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এনেছে।
আটককৃতদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার বড়কাপন গ্রামের মো. আছাদ আলীর ছেলে সাদিকুল হক সাদিক (২০), কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিন্ধি গ্রামের রসরাজ বিশ্বাসের ছেলে অর্পন বিশ্বাস (২১) এবং কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার জিরুইন গ্রামের শওকত আহমেদের ছেলে রিফাত (২২)। তারা সবাই বর্তমানে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। পুলিশ বলছে, নগরীতে অবস্থান করে তারা কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনে কোতোয়ালী থানা-য় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আমরা নিয়মিত টহল বাড়িয়েছি।”
উল্লেখ্য, এর আগেও একই ওয়াকওয়েতে উত্যক্ত ও টাকা দাবির একটি ঘটনা ঘটে, যেখানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ-এর এক ছাত্র ও এক ছাত্রীকে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায়ও একজনকে আটক করা হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একই স্থানে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাগরদিঘীরপাড় ওয়াকওয়ে সিলেট শহরের একটি জনপ্রিয় অবসরযাপন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এখানে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা দম্পতিরা সময় কাটাতে আসেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় এই স্থানটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাতের দিকে এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাত গভীর হলে ওয়াকওয়ের কিছু অংশে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নিরাপত্তা টহলের সীমাবদ্ধতা অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। তাদের মতে, নিয়মিত পুলিশি টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের ঘটনা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীর জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তারা আশা করছেন, সাম্প্রতিক অভিযানে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও তথ্য পাওয়া যাবে, যা একই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত করতে সহায়ক হবে।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী দম্পতির মানসিক অবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকাশ্যে এমন হয়রানি ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া যে কারও জন্যই ভীতিকর অভিজ্ঞতা। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই নয়, বরং নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দকেও ব্যাহত করে।
সব মিলিয়ে, সাগরদিঘীরপাড় ওয়াকওয়েতে পরপর এ ধরনের ঘটনা নগর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিলেটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরে নিরাপদ জনপরিসর নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার বিষয়। সাম্প্রতিক এই ঘটনা সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

