প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পৌর শহরের ইকড়ছই অটোরিকশা স্ট্যান্ড এলাকায় পণ্যবাহী একটি ট্রাকের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী শাহরিয়ার হোসেন (১৭) ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্থানীয় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত শাহরিয়ার হোসেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার তেঘরি (নোয়াগাঁও) গ্রামের কমলা মিয়ার ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তারা বর্তমানে জগন্নাথপুর উপজেলার ইকড়ছই এলাকায় বসবাস করছিলেন। অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব ও দৈনন্দিন কাজে সহায়তার জন্য সে মোটরসাইকেল চালাত বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, সুনামগঞ্জ দিক থেকে ছেড়ে আসা একটি মালবাহী ট্রাক জগন্নাথপুর-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে দ্রুতগতিতে আসছিল। একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে আসা মোটরসাইকেলের সঙ্গে ট্রাকটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতায় মোটরসাইকেল চালক শাহরিয়ার ছিটকে পড়ে যান এবং ট্রাকের পেছনের চাকার নিচে চাপা পড়েন।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি তাৎক্ষণিকভাবে থামেনি, বরং কিছু দূর পর্যন্ত কিশোরটিকে টেনে নিয়ে যায়। এতে তার শরীরের নিচের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জানান, শাহরিয়ারকে হাসপাতালে আনার সময় তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। চিকিৎসকরা দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে হাসপাতালে আনার মাত্র ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, আঘাতের মাত্রা এতটাই গুরুতর ছিল যে বাঁচানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় জনতা ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। এ সময় উত্তেজিত জনতা ট্রাকটিতে ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় বলেও জানা যায়। পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুরো এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোগান্তি দেখা দেয়।
খবর পেয়ে জগন্নাথপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পুলিশ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের শান্ত করার উদ্যোগ নেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় এবং মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাকের চালক ও হেলপারকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই সড়কে প্রায়ই বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল করে, যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তারা এ ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
শাহরিয়ারের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনরা জানান, সে ছিল পরিবারের একমাত্র সহায় এবং অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল। তার এমন অকাল মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকাবাসী শোকাহত। প্রতিবেশীরা বলেন, একজন কিশোরের এমন নির্মম মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
দুর্ঘটনার পর থেকে এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা বেপরোয়া গতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


