প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলায় চার বছরের শিশু ফাহিমাকে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনও শোকাহত পুরো সিলেট। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও বিচারের দাবিতে জনমতের চাপ। এমন এক প্রেক্ষাপটে নিহত শিশু ফাহিমার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে সিলেট মহানগর জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। সোমবার (২৫ মে) দুপুরে দলটির একটি প্রতিনিধি দল ফাহিমার বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানায় এবং ঈদ উপলক্ষে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মো. শাহজাহান আলী, সদর উপজেলা জামায়াতের আমীর নাজির উদ্দিন, নায়েবে আমীর আব্দুল লতিফ লালা, সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল আল ইমরান, ৮নং কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল মনাফ এবং কান্দিগাঁও ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল কাইয়ুম। এ সময় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসীও উপস্থিত ছিলেন। নিহত শিশুর বাবা রায়ছুল হক ও মা রুবেনা বেগমের হাতে নগদ আর্থিক সহায়তা তুলে দেন জামায়াত নেতারা।
ফাহিমার বাড়িতে গিয়ে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা। শিশুটির খেলনা, পোশাক ও স্মৃতিগুলো এখনও ঘরের কোণে ছড়িয়ে আছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, প্রতিটি দিন তাদের কাছে এখন এক অসহনীয় যন্ত্রণা। ছোট্ট মেয়েটির নির্মম মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এ সময় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, শিশু ফাহিমার ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে তা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে, তা পুরো জাতিকে শোকাহত ও বিক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলেন, শুধু ফাহিমা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বেশিরভাগ শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকাসক্তদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষায়, মাদক এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, “ফাহিমা, ঢাকার রামিসাসহ বিভিন্ন শিশু হত্যার ঘটনায় জড়িতদের অনেকেই মাদকসেবী। এটি অত্যন্ত ভয়ংকর বাস্তবতা। মাদক নির্মূলে কঠোর ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।”
ফখরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনও মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি আদালত খোলার প্রথম কার্যদিবসেই চার্জশিট দাখিলের জোর দাবি জানান এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এক মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, দেশের ইতিহাসে মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার ২৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল, যা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একইভাবে ঢাকার আলোচিত রামিসা হত্যা মামলার চার্জশিটও অল্প সময়ের মধ্যেই দাখিল করা হয়েছে। তাহলে ফাহিমা হত্যাকাণ্ডে কেন ধীরগতি—এ প্রশ্ন এখন সিলেটবাসীর।
বক্তব্যে তিনি সিলেটের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার দাবি, সিলেটে ছিনতাই, রাহাজানি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি মাদকসেবীর ছুরিকাঘাতে এক র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অপরাধে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে অনেক সময় আইনের আওতায় আনা হয় না, যার ফলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, আগে অপহরণকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সন্তান গ্রেফতার হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রমাণ করে অপরাধীরা নানা ছত্রচ্ছায়ায় থেকে সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে। সিলেট-১ আসনের নির্বাচনের আগে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফখরুল ইসলাম বলেন, “সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতির ৫০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা অবনতির দিকে গেছে। সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এভাবে একটি সমাজ বা রাষ্ট্র চলতে পারে না।”
এদিকে, ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া শিশু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, আলোচিত ও সংবেদনশীল মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও বিচার জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও সমান জরুরি। কারণ বিচারে বিলম্ব যেমন ক্ষোভ বাড়ায়, তেমনি তড়িঘড়ি করে দুর্বল তদন্তও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সিলেটের সচেতন মহল মনে করছে, ফাহিমা হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরও নির্মম প্রতিচ্ছবি। তারা বলছেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হলে মাদক, অপরাধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংসতা ঘটানোর সাহস না পায়।
ফাহিমার পরিবারের একটাই দাবি—তাদের শিশুকন্যার হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। সেই দাবির প্রতিধ্বনি এখন সিলেট ছাড়িয়ে সারা দেশের মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে।


