প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং সহিংস অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একের পর এক ভয়াবহ ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নগর ও সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মাদকসেবীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছেন। শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলোর পেছনেও মাদকের প্রভাব উঠে আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে করে সিলেটের সামাজিক নিরাপত্তা ও জনজীবন নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীরও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, সিলেটে সংঘটিত অধিকাংশ ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও সহিংস অপরাধের সঙ্গে মাদকসেবীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তিনি বলেন, সীমান্তপথ দিয়ে যেন কোনোভাবেই মাদক দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের ওপর নজরদারি বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন র্যাব-৯ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সহিংস অপরাধের পেছনে মাদকের বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নগরের কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
রোববার (২৪ মে) সিলেট নগরের কাজিরবাজার গরুর হাটে ঈদ উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সিলেট বিভাগের চার জেলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদকবিরোধী বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকায় মাদকের প্রবেশ তুলনামূলক বেশি হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা, কোম্পানীগঞ্জ ও সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি এলাকা দিয়ে মূলত গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও ইয়াবা দেশে প্রবেশ করছে। পরে এসব মাদক দ্রুত সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে বড় পরিসরে দীর্ঘ সময় মাদক মজুত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে র্যাব। তবে মাদক কারবারিরা ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন কৌশলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে।
সিলেটকে ঘিরে মাদকের বিস্তারের পেছনে তিনটি বড় কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, এটি একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল। দ্বিতীয়ত, সিলেট একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। তৃতীয়ত, এখানে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী পরিবারের বসবাস রয়েছে। এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই মাদক ব্যবসায়ীরা সহজে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন বাড়ে। সেই সুযোগে কিছু অসাধু চক্র হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় মাদক সরবরাহের চেষ্টা করে। ফলে ঈদের আগে থেকেই এসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, নগরের বিভিন্ন ‘হটস্পট’ এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক এখন শুধু সীমান্ত কিংবা নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে নগরের অলিগলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের আচরণে পরিবর্তন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকাতেও মাদক কারবারিদের আনাগোনা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও বড় কারণ। মাদকাসক্ত তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, শিক্ষাজীবন নষ্ট হচ্ছে, আর্থিক সংকটে জড়িয়ে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। এর প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়ছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তারে মাদক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তারা।
র্যাব-৯ দাবি করেছে, চলতি বছরে সিলেট অঞ্চলে মাদক উদ্ধারে তাদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। দেশের ১৫টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে মাদক উদ্ধারে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বহু মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের বিকল্প ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, শুধু ঈদকে কেন্দ্র করে নয়, সার্বক্ষণিকভাবেই মাদক, অনলাইন জুয়া ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে র্যাব।
সিলেটের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ ঠেকানো, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত অভিযান পরিচালনা এবং তরুণ সমাজকে সচেতন করার মধ্য দিয়েই কেবল এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শান্ত পরিবেশ ও প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সিলেট এখন অপরাধ ও মাদক বিস্তারের আলোচনায় উঠে আসছে—যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটকে আবারও নিরাপদ ও স্বস্তির নগরীতে পরিণত করবে।


