প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলী-এর স্মরণে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিলে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যাঁরা জীবন দিয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের ত্যাগ দেশের গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের ত্যাগ কোনোদিনই বৃথা যায় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা জাতির পথচলায় প্রেরণা হয়ে ওঠে।
শুক্রবার সিলেট নগরীর ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে জুমার নামাজ শেষে আয়োজিত দোয়া মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ইলিয়াস আলীর স্মরণে স্থানীয় বিএনপি ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে এই দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মন্ত্রী বলেন, “দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন গণতন্ত্রের জন্য মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের কাছে শুধু স্মরণীয় নয়, বরং ভবিষ্যতের পথনির্দেশক।” তিনি আরও যোগ করেন, এসব ত্যাগের মধ্য দিয়েই একটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিপক্ব হয় এবং গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।
এ সময় তিনি ইলিয়াস আলীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তাঁর নিখোঁজ হওয়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং এটি এখনো মানুষের মনে প্রশ্ন ও বেদনার জন্ম দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, ইলিয়াস আলীর মতো নেতাদের অবদান এবং তাঁদের আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
দোয়া মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, অতীতের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হলে দেশের জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।”
তিনি এ সময় রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। মন্ত্রী বলেন, দলটি আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দলটি এগিয়ে যেতে চায়, যেখানে গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আসন্ন কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগামী ২ মে তারেক রহমানের সিলেট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সফরকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, সফরের সময় সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের উদ্বোধন হতে পারে, যা স্থানীয় জনগণের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
বিশেষ করে তিনি বাসিয়া নদীর পুনঃখনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। একসময় এলাকার জীবন ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত এই নদীটি বর্তমানে অনেকাংশেই খালে পরিণত হয়েছে বলে জানান তিনি। নদীটির পুনরুদ্ধার হলে শুধু পরিবেশগত ভারসাম্যই ফিরবে না, বরং কৃষি, মৎস্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী বলেন, “নদী আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি নদী পুনরুদ্ধার মানে শুধু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা নয়, বরং একটি অঞ্চলের সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে পুনর্জীবিত করা।” তিনি আরও জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা হ্রাস পাবে এবং বন্যা ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে আরও কিছু কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জনগণের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, “দলমত নির্বিশেষে আমরা সব সময় মানুষের পাশে থাকতে চাই। সিলেটবাসীর প্রতি আমাদের একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে, কারণ এই অঞ্চলের মানুষ সব সময় রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে।”
বিচার ও জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। তিনি বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, যেসব ঘটনা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত হোক এবং সত্য উদঘাটিত হোক।”
এছাড়া আসন্ন মে মাসে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, আগাম পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইলিয়াস আলীর স্মরণে আয়োজিত এই দোয়া মাহফিল এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যগুলো শুধু একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং উন্নয়ন নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনার অংশ। এতে যেমন অতীতের ঘটনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য একটি দিকনির্দেশনাও তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইলিয়াস আলীর স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যগুলো আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি জাতির গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ত্যাগ ও সংগ্রামের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণমুখী উদ্যোগ প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।


