প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) আসন্ন পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন ঘিরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। তিনটি ক্যাটাগরিতে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের পর থেকেই উঠে এসেছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতাদের স্বজন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতির চিত্র, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ক্রীড়া মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
নির্বাচনের জন্য মোট ৩৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজনের মনোনয়ন বাতিল হলেও বাকি ৩২ জন চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রার্থীদের বড় একটি অংশই রাজনৈতিক পরিবার বা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে গোপালগঞ্জের এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তবে তিনি আপিল করার সুযোগ পাচ্ছেন। এর বাইরে নির্বাচনী মাঠ এখন পুরোপুরি সাজানো হয়েছে তিনটি ক্যাটাগরিতে, যেখানে আঞ্চলিক ও জেলা ক্রিকেট, ঢাকা মহানগর ক্লাব এবং অন্যান্য প্রতিনিধি মিলিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ক্যাটাগরি-১ বা আঞ্চলিক ও জেলা ক্রিকেট বিভাগ। এখানে ১০টি পরিচালকের বিপরীতে ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কয়েকটি বিভাগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। ঢাকাসহ কয়েকটি বিভাগে একক প্রার্থী থাকায় ভোট ছাড়াই ফল নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এই ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। রংপুর বিভাগ থেকে প্রার্থী হয়েছেন Mirza Faysal Amin, যিনি বিএনপি মহাসচিব Mirza Fakhrul Islam Alamgir-এর ভাই হিসেবে পরিচিত। রাজশাহী বিভাগ থেকে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন মীর শাকরুল আলম, যিনি সরকারের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে। সিলেট বিভাগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং একই সঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবেও পরিচিত।
ঢাকা বিভাগেও নির্বাচনী সমীকরণে এসেছে পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়। গোপালগঞ্জের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে সাইদ বিন জামান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির চাচা মাঈন উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এবং শরীফুল ইসলাম অপু।
খুলনা বিভাগেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ হাইপ্রোফাইল। এখানে শান্তনু ইসলাম, যিনি প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলামের ভাই, নির্বাচন করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দসহ আরও কয়েকজন প্রার্থী।
বরিশাল বিভাগে একমাত্র পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুইজন। একজন ভোলার মুনতাসির আলম চৌধুরী, যিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। অন্যজন মিজানুর রহমান, যিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তামিম ইকবালের ঘনিষ্ঠ এবং ফরচুন বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
ক্যাটাগরি-২ বা ঢাকা মহানগর ক্লাব বিভাগেও প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১২টি পদের বিপরীতে ১৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই ক্যাটাগরিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে রাজনৈতিক পরিবার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের অংশগ্রহণ।
এখানে প্রার্থী হয়েছেন Ishrafil Khosru, যিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে। একইভাবে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ, যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে, এবং মির্জা ইয়াসির আব্বাস, যিনি সাবেক ঢাকা মেয়র ও রাজনীতিক মির্জা আব্বাসের ছেলে, তারাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে পরিচিত বর্তমান অ্যাডহক কমিটির প্রধান Tamim Iqbal-এর ক্লাব থেকেও প্রার্থী রয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাব থেকে সরাসরি তার ঘনিষ্ঠদের অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য ক্লাব থেকে প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আবাহনী, শাইনপুকুর ও অন্যান্য ক্লাব থেকেও বিভিন্ন পরিচিত মুখ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এই ক্যাটাগরিতে আরও কয়েকজন প্রাক্তন বোর্ড পরিচালকও রয়েছেন, যারা পূর্ববর্তী প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।
সবচেয়ে ছোট ক্যাটাগরি হলেও ক্যাটাগরি-৩ বা অন্যান্য প্রতিনিধি বিভাগেও গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম উঠে এসেছে। এখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল এডুকেশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তিনি তামিম ইকবালের ফুফা হিসেবে পরিচিত।
পুরো নির্বাচন ঘিরে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবের উপস্থিতি। অনেকেই মনে করছেন, ক্রীড়াঙ্গনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নির্বাচনে যোগ্যতা ও ক্রিকেট উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক অবস্থান বেশি প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে সমর্থক ও প্রার্থীদের একটি অংশ বলছে, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনায় অনেকেই উপযুক্ত জায়গায় আছেন। তাদের মতে, ক্রিকেট প্রশাসনে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নতুন কিছু নয় এবং এটি বাস্তবতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
তবে সমালোচকদের মতে, যদি একই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশের ক্রিকেট প্রশাসন আরও বেশি প্রভাবনির্ভর হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নির্বাচন এখন কেবল একটি ক্রীড়া সংগঠনের নির্বাচন নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের একটি বড় প্রতিফলন হিসেবে সামনে এসেছে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গন ও সাধারণ দর্শকদের মধ্যে এখন চরম আগ্রহ ও অপেক্ষা কাজ করছে।


