প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রায় চার বছর আগে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়েছিলেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন। পরিবারের কাছে তিনি যেন এক রহস্যে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন এবং বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একসময় জানা যায়, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন জাকির। দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে তিনি দেশে ফিরেছেন। প্রায় চার বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দ, স্বস্তি ও আবেগে ভাসছে তার পরিবার।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে জাকির হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। পুরো প্রক্রিয়ায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) দুপুরে শেওলা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ এসআই এমএইচ সজল বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং উভয় দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশের উপস্থিতিতে জাকির হোসেনকে গ্রহণ করা হয়। পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা এবং আইনানুগ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর তাকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশে ফিরে আসা জাকির হোসেনের বয়স বর্তমানে ৩৪ বছর। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার ৯ নম্বর সুরমা-কালিকাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং আব্দুল মান্নানের ছেলে। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, জাকির মানসিক প্রতিবন্ধিতার সমস্যায় ভুগছিলেন। পরিবারের ধারণা, সেই অবস্থাতেই তিনি অজান্তে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান এবং পরে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২১ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিদিনের মতো সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন জাকির। কিন্তু দিন শেষে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। এরপর শুরু হয় নিরন্তর খোঁজাখুঁজি। আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন জেলা, সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল—সব জায়গায় খোঁজ করা হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একসময় পরিবার ধরে নেয়, হয়তো আর কোনোদিন ছেলেকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই কেটে যায় প্রায় চার বছর।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। একটি মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন জাকির। খবরটি পাওয়ার পর নতুন করে আশার আলো দেখেন তার স্বজনরা। এরপর শুরু হয় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ।
জাকিরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়। তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব যাচাই, ট্রাভেল পারমিট সংগ্রহ এবং প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লাগে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, গুয়াহাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন জাকির হোসেনকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে তিন মাস মেয়াদি একটি ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে। ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়, শিলচর কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সাজার মেয়াদ ৮ মে শেষ হয়েছে এবং তাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।
তবে ট্রাভেল পারমিট পাওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, সীমান্ত সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রক্রিয়ার কারণে তাকে আরও কিছুদিন ভারতে অপেক্ষা করতে হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়।
গত ১৯ জুন ‘ট্রাভেল পাস পেলেও ভারত থেকে ফিরতে পারছেন না সিলেটের জাকির’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দ্রুত যোগাযোগ শুরু হয় এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই শেষ পর্যন্ত জাকিরের দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার শেওলা স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফ জাকিরকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর ইমিগ্রেশন পুলিশ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে তাকে পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয়।
চার বছর পর প্রিয়জনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। বহুদিনের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার অবসান ঘটায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, এত দীর্ঘ সময় পরও জাকিরকে জীবিত ফিরে পাওয়া তাদের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ অত্যন্ত আনন্দের ঘটনা।
জাকিরের বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, ছেলেকে ফিরে পেয়ে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ। দীর্ঘদিন কোনো খবর না পেয়ে তারা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ছেলেকে ফিরে পাওয়া তাদের পরিবারের জন্য এক অবর্ণনীয় আনন্দের মুহূর্ত।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানসিক প্রতিবন্ধী বা অসহায় মানুষ অনেক সময় পথ হারিয়ে অন্য দেশে প্রবেশ করে নানা আইনি জটিলতায় পড়েন। পরিচয় নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় অনেকের স্বজনদেরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এমন ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রশাসন, কূটনৈতিক মিশন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জাকির হোসেনের প্রত্যাবাসনের ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। দীর্ঘ চার বছরের বিচ্ছেদের পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে আসা শুধু একটি প্রশাসনিক সাফল্য নয়, এটি একটি মানবিক গল্পও বটে। নিখোঁজ হওয়ার পর যাকে আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না বলে ধরে নিয়েছিল পরিবার, সেই জাকির আজ আবার নিজের বাড়িতে, নিজের আপনজনদের মাঝে। তার ফিরে আসা পরিবারকে যেমন নতুন স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি সীমান্ত অতিক্রম করে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত শনাক্ত ও প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।


