প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় ফের বন্যার আশঙ্কায় প্রহর গুণছে সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো। টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের নদ-নদীর পানি প্রবাহে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাঁচ জেলায় স্বল্পমেয়াদী বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা কেবল নিমাঞ্চলকে প্লাবিত করার শঙ্কা জাগাচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের জনজীবনে নতুন করে দুর্ভাবনার কালো মেঘ ঘনিয়ে আনছে। বছরের এই সময়ে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
আবহাওয়া অফিস ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম প্রদেশে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে নেমে আসা পানি দেশের প্রধান নদীগুলোর প্রবাহকে উত্তাল করে তুলেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞগণের মতে, আগামী পাঁচ দিনে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগসহ সংলগ্ন উজানের ভারতীয় প্রদেশগুলোতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকবে। ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি সমতল আগামী তিন দিনে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নিমাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যার ঝুঁকি প্রবল হয়ে উঠেছে।
সিলেট ও ময়মনসিংহের নদ-নদীগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। যদিও সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী ও কংস নদীর পানি বর্তমানে হ্রাস পাচ্ছে এবং যাদুকাটা ও ভূগাই নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে, তবে আগামী ৭২ ঘণ্টায় উজানের বৃষ্টির পানি নদ-নদীতে গড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। রংপুর বিভাগের তিস্তা নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি কমার প্রবণতা আগামী দুই দিন অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় টেকনাফে ১৪৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিলেট এবং চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বন্যাকবলিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির তোড় সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা অধিকাংশ নদ-নদীর নেই। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই এসব অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় নদ-নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অত্যন্ত ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়, যা বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। সিলেট অঞ্চলের মানুষ যারা গত কয়েক বছরে কয়েকবার ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন, তারা আকাশের মেঘ দেখলেই এখন আতঙ্কে শিউরে ওঠেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া বা পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করা তাদের জীবনের এক চরম নির্মম অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর প্রাথমিক পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, কেবল দুর্যোগের সময় সহায়তা করাই যথেষ্ট নয়, বরং স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে নদ-নদী খনন ও কার্যকর বাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষিজমির ক্ষতি আর গবাদি পশুর নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে হাওর ও নিমাঞ্চলের মানুষ এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে যারা নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করেন, তাদের উদ্বেগের শেষ নেই। ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার জন্য দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নিয়মিত নদ-নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জনসাধারণকে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার জন্য সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বন্যায় কেবল মানুষের জানমালের ক্ষতি হয় না, বরং স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়া এবং শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় নেমে আসে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদী বন্যাও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহকে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে এই সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতির ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, উজানে অবাধে বন উজাড় এবং নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড় থেকে পানি নেমে আসাটা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে দেশের মানুষ যেন কোনোভাবেই গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হন, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিন মেনে চললে এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সিলেট ও চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মনে এখন কেবল একটিই প্রত্যাশা—প্রকৃতি যেন তাদের ওপর খুব বেশি রূঢ় না হয় এবং ভয়াবহ এই বন্যা পরিস্থিতি থেকে সৃষ্টিকর্তা তাদের রক্ষা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে বন্যার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। স্বল্পমেয়াদী এই বন্যার শঙ্কা আমাদের পরিবেশ ও সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। কেবল দুর্যোগের মোকাবিলা নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি সচেতন নাগরিককেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আগামী কয়েক দিন খুবই সংকটপূর্ণ, তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আশা করি, সরকারি সঠিক তদারকি ও জনগণের সম্মিলিত সচেতনতায় আসন্ন এই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।


