প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নর্থ নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় পাঁচ বছরের অবুঝ শিশু আসমা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ চার বছরের বিচারিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়েছে। সোমবার সকালে নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা আকতার এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে একমাত্র আসামি মো. শাহাদাত হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধীকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি বীভৎস ও নৃশংস ঘটনার বিচারিক সমাপ্তি ঘটল, যা দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাবাসীর মনে এক গভীর ক্ষোভ ও শোকের কালো ছায়া ফেলে রেখেছিল।
২০২২ সালের ২৪ মার্চ দুপুরে চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের মেঘা গ্রামের মৃধা বাড়িতে ঘটেছিল এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। আসমা আক্তার ছিল স্থানীয় মাওলানা মো. শাহজাহানের পাঁচ বছর বয়সী আদরের কন্যা। ঘটনার দিন দুপুরবেলা থেকেই শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাড়ির চারপাশ, আত্মীয়-স্বজনের ঘর এবং সম্ভাব্য সব জায়গায় তাকে খুঁজতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। দীর্ঘ নয় দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক তথ্য। আসমার সম্পর্কে আপন চাচাতো ভাই শাহাদাত হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাড়ির পেছনের একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে শিশুটির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে শাহাদাত হোসেনের জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসে অমানবিকতার এক চরম চিত্র। ঘটনার দিন দুপুরে কোনো এক সুযোগ বুঝে সে শিশুটিকে প্রলুব্ধ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর অত্যন্ত পাশবিক কায়দায় শিশুটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করার পর শাহাদাত বুঝতে পারে যে, আসমা বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের কাছে বলে দিতে পারে। এই ভয় থেকে সে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যার পর অপকর্মের আলামত গোপন করার জন্য শিশুটির মরদেহ বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। নিজের অপকর্ম ঢাকতে সে যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এই স্বীকারোক্তি পুরো এলাকাবাসীকে হতভম্ব করে দিয়েছিল।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর নোয়াখালীর প্রতিটি স্তরের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ বছরের একটি শিশুর ওপর এমন বর্বর নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে পুরো নোয়াখালী উত্তাল হয়ে উঠেছিল। বিচারের দাবিতে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো টানা কয়েকদিন রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সবার দাবি ছিল একটাই—দ্রুততম সময়ে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করে ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। আজ সেই প্রতিবাদের জয় হলো। রায় ঘোষণার সময় আদালতের বাইরে উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে কয়েক দফা রায়ের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছিল, যা নিয়ে শিশুটির পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোমবার ৬ জুলাই রায় ঘোষণার দিন ধার্য হলে সকালে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শুক্লা সাহা মামলার রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালত পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামির নিজের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই এই রায় প্রদান করেছেন। শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের যে দাবি দীর্ঘদিনের ছিল, আজ এই রায়ের মাধ্যমে আদালত সেই সাহসের পরিচয় দিলেন। তিনি আরও বলেন, এই রায় সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে যে, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।
নিহত আসমার বাবা মাওলানা মো. শাহজাহান বিচার প্রক্রিয়া শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, চার বছর ধরে তারা এক চরম মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে দিন পার করেছেন। তাদের কলিজার টুকরা সন্তানকে হারানোর শোক আজও তাদের তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, আজ অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ার মাধ্যমে কিছুটা হলেও মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। তবে কোনো শাস্তিই তাদের আদরের সন্তানের অভাব পূরণ করতে পারবে না। তিনি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন যারা শুরু থেকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বিচারের দাবি তুলেছিলেন।
এই নির্মম ঘটনাটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক গভীর ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভেতরেই যখন এমন পাশবিকতা ঘটে, তখন আমাদের পারিবারিক কাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আসমা হত্যার ঘটনায় অপরাধীর আত্মীয় হওয়ার পরিচয় কোনোভাবেই তাকে রেহাই দেয়নি। আদালত আইন ও ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে বিচার করেছেন। আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নৈতিক শিক্ষা এবং শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি। আসমার এই করুণ পরিণতি যেন আগামীতে কোনো শিশুর ক্ষেত্রে আর না ঘটে, সেটাই আজ সকলের সম্মিলিত প্রার্থনা।
বিচারিক এই রায়ের মধ্য দিয়ে নোয়াখালীর চাটখিলের মেঘা গ্রামের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আজ কিছুটা হলেও পরিষ্কার হয়েছে। অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের একটি অবিচল অবস্থান। আশা করা হচ্ছে, আইনি ধাপগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে এই রায় দ্রুত কার্যকর করা হবে। অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে যেমন শিশুটির পরিবার শান্তি পাবে, তেমনি ভবিষৎ খুনি ও ধর্ষকদের মনেও ভীতির সঞ্চার হবে। আজ একটি অবুঝ শিশুর করুণ মৃত্যুর বিচারের মাধ্যমে আইনের শাসন আবারও জয়ী হলো। আসমার স্মৃতিতে শোক পালনের পাশাপাশি তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই বিচারিক জয়ের ধারাবাহিকতা যেন সব ক্ষেত্রে বজায় থাকে, সেটিই প্রত্যাশা।


