বিএসএফের বাধায় মনু বাঁধের কাজ থমকে, বাড়ছে শঙ্কা

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার লাখো মানুষের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রকল্প। বর্ষা মৌসুমে মনু নদীর ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যা থেকে জনপদকে সুরক্ষা দিতে কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছিল শত কোটি টাকার এই প্রকল্প। প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও সীমান্তসংলগ্ন চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ গত দুই বছর ধরে থমকে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর আপত্তির কারণেই এসব স্থানে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে মনু নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন মনু নদী বাংলাদেশের কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বর্ষণে নদীটির পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রতি বছরই নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যায় হাজারো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২০-২১ অর্থবছরে মনু নদীর প্রতিরক্ষা, নদী খনন, চর অপসারণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্গঠনের একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করে।

৩০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে মোট ২৮টি প্যাকেজের আওতায় কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের ২০টি প্যাকেজ, চর অপসারণের চারটি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্গঠনের আরও চারটি প্যাকেজ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামগ্রিকভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সীমান্তঘেঁষা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ আটকে থাকায় পুরো প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মানুষ।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, শরীফপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর, দত্তগ্রাম এবং তেলিবিল সীমান্ত এলাকা। এসব স্থান আন্তর্জাতিক সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে প্রতিরক্ষা বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নিলেই বিএসএফ আপত্তি জানায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে গত দুই বছর ধরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার বাঁধের সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে।

এরই মধ্যে চলতি বর্ষায় টানা বৃষ্টি ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে মনু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলে শিকড়িয়া এলাকার পুরোনো ভাঙন দিয়ে আবারও পানি প্রবেশ করে। এতে পাঁচ থেকে ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসংখ্য ঘরবাড়ি, আউশ ধানের ক্ষেত, স্থানীয় সড়ক এবং গ্রামীণ অবকাঠামো। অনেক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়।

সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় শিকড়িয়া প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ১০০ ফুট অংশ ভেঙে যায়। সেই ভাঙা অংশ আজও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়নি। বর্ষা এলেই ওই স্থান দিয়ে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে নতুন করে বন্যা সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ওপর স্থানীয়রা নিজের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন তারা।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য তাহির আলী বলেন, ২০২৪ সালের বন্যার পর থেকে শিকড়িয়ার বাঁধ সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী। কিন্তু দুই বছর পার হলেও কাজ শুরু হয়নি। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে আবারও পুরোনো ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না হলে সামনে আরও বড় দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় সংগঠক ফয়জুল হক ও জিয়াউর রহমান ফরিদ জানান, প্রতি বর্ষায় একই ধরনের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। মানুষ জানে না কখন নদীর পানি গ্রামে ঢুকে পড়বে। কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে রয়েছে। তারা বলেন, সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় যদি কোনো কূটনৈতিক জটিলতা থেকেও থাকে, তাহলে দুই দেশের সরকারের উদ্যোগে দ্রুত তার সমাধান করা প্রয়োজন।

শুধু শিকড়িয়াই নয়, রাজাপুর, বেলেরতল ও ছৈদল এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর কাজও নানা কারণে ধীরগতিতে চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারদের গড়িমসি, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা এবং সময়মতো অর্থ ছাড় না পাওয়ার কারণেও অনেক স্থানে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়েছে।

মনু নদীর ভাঙনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় কুলাউড়ার টিলাগাঁও, হাজীপুর, শরীফপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নসহ রাজনগর এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই অসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা বাঁধ নিয়ে এবারও মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

চলতি বছরের ৯ জুলাই রাজনগর উপজেলার উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে প্রায় ১২০ ফুট ভাঙন দেখা দেয়। এতে আশপাশের ১০ থেকে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ সময়মতো সম্পন্ন হলে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো যেত।

মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। কিন্তু সীমান্তবর্তী চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ এখনো শুরু না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, ভারতের ত্রিপুরা অংশে নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানকার কর্তৃপক্ষ দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করলেও বাংলাদেশের অংশে একই কাজ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।

বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলাম চলতি অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে সীমান্তবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ আটকে থাকার বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে সীমান্তবর্তী চারটি স্থানে একাধিকবার কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিএসএফের আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, শরীফপুর ইউনিয়নের চারটি স্থানে মোট প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার বাঁধের কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এ বিষয়ে ২০২৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে নয়াদিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, মনু নদীর বৃহৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে জেলা উন্নয়ন সভায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএসএফের আপত্তির বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, সীমান্তবর্তী শিকড়িয়া ও দত্তগ্রাম এলাকায় মনু নদীর ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা বাঁধে মাটি ভরাটসহ প্রয়োজনীয় কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারদের বিজিবি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত সমাধান এবং বাকি কাজ শেষ করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করার প্রত্যাশায় রয়েছেন নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

১৫ বছরের সংসারের ইতি টানলেন ঊর্মিলা-আদীনাথ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নবীগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কড়াকড়ি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি, যা জানা যাচ্ছে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

১৫ বছরের সংসারের ইতি টানলেন ঊর্মিলা-আদীনাথ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তে প্রশাসন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নবীগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কড়াকড়ি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি, যা জানা যাচ্ছে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মৌলভীবাজারে বন্যায় ৯৫ কিমি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, দুর্ভোগ চরমে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চার বছর পর দেশে ফিরলেন জাকির, স্বস্তিতে পরিবার

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাহুবল থানার ওসি প্রত্যাহার, দায়িত্বে তদন্ত ওসি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ