প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশি শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ভিসা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নতুন বিধিমালার মাধ্যমে এসব ভিসার মেয়াদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, বিষয় পরিবর্তন এবং পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এফ (F) ভিসা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের জন্য জে (J) ভিসা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য আই (I) ভিসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে এসব ভিসা সাধারণত সংশ্লিষ্ট শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা পেশাগত কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত বৈধ থাকে। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে নির্দিষ্ট সময় পর ভিসাধারীদের নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে হবে অথবা যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে পুনরায় ভিসা নিয়ে প্রবেশ করতে হবে।
বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, এটি ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশের ৬০ দিন পর, কংগ্রেসের পর্যালোচনা সাপেক্ষে কার্যকর হবে। ফলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন নীতির বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক কঠোরতা আরোপ করেন। তার প্রশাসন শুধু অবৈধ অভিবাসন নয়, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাতেও কড়াকড়ি বৃদ্ধি করেছে। রাজনৈতিক বা আদর্শগত মতামতের অভিযোগে একাধিক বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিলের ঘটনাও আলোচনায় আসে। একই সময়ে কয়েক লাখ অভিবাসীর বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগও প্রত্যাহার করা হয়।
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ চার বছর নির্ধারণ করা। অর্থাৎ শিক্ষাক্রম বা গবেষণার সময়কাল এর চেয়ে বেশি হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তাদের নতুন করে অনুমতির আবেদন করতে হবে।
বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে অনেক বিদেশি সাংবাদিক একাধিক বছরের জন্য আই ভিসা পেয়ে থাকেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী তাদের ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ২৪০ দিন। আর চীনা সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই মেয়াদ আরও কমিয়ে মাত্র ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও প্রয়োজন অনুযায়ী মেয়াদ শেষে নবায়নের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
চীনা সাংবাদিকদের জন্য পৃথক মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়টি আগেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। গত বছরের আগস্টে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নীতিকে বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেছিল। তবে নতুন বিধিমালা প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার চীনের দূতাবাস থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নতুন নীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর আরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাদের পড়াশোনার লক্ষ্য পরিবর্তন কিংবা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হতে পারবেন না। এছাড়া পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের জন্য যে ৬০ দিনের সময়সীমা এতদিন চালু ছিল, সেটিও কমিয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাকরি খুঁজে স্পনসর সংগ্রহ অথবা অন্য বৈধ অভিবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হতে পারে।
নতুন নীতির সমালোচনা করেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা। সাবেক ডিএইচএস কর্মকর্তা ডাগ র্যান্ড বলেন, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে আগ্রহী। কিন্তু নতুন এই বিধিমালা সেই লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোচ্ছে।
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের অভিবাসনবিষয়ক পরিচালক ডেভিড জে. বিয়ারও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের বিষয় পরিবর্তন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলের ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপের সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এখন তাদের মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে চাকরি খুঁজে স্পনসর নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় তারা বৈধ অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এই নীতির যথেষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, নতুন নিয়মের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ডিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ-অভিবাসী শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে ১৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। একই অর্থবছরে পাঁচ লাখেরও বেশি ব্যক্তি সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এছাড়া প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ বিদেশি সাংবাদিককে আই ভিসা দেওয়া হয়েছে।
ডিএইচএসের ভাষ্য, এত বিপুলসংখ্যক অ-অভিবাসী ভিসাধারীর কার্যকর তদারকি ও নজরদারি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তাদের দাবি, এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীরা একই ভিসার আওতায় দীর্ঘ সময়, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছেন। প্রশাসনের মতে, নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করলে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে।
তবে শিক্ষাবিদদের একাংশের আশঙ্কা, নতুন এই বিধিমালা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পিএইচডি, পোস্টডক্টরাল গবেষণা কিংবা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহও কিছুটা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু নতুন ভিসা নীতির কারণে ভবিষ্যতে বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের জন্য দেশটিতে অবস্থান ও কার্যক্রম পরিচালনা আগের তুলনায় আরও কঠিন হতে পারে। এখন কংগ্রেসের পর্যালোচনা শেষে বিধিমালাটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে এর বাস্তব প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট মহলের।


