প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের দানবাক্স ও ডেক সিলগালা করে সিসিটিভির নজরদারিতে অর্থ গণনার পর বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণালংকার এবং মানতের পশু পাওয়ার ঘটনা এসব অভিযোগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, দান সংগ্রহ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুন এবং ১১ জুলাই—এই দুই দফায় মাজারের দানবাক্স ও ডেক খুলে গণনা করা হয়। প্রথমবার চার দিনের ব্যবধানে সংগৃহীত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। দ্বিতীয়বার, ১৯ দিনের ব্যবধানে গণনা করে পাওয়া যায় আরও ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে মোট ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা জমা হয়েছে। এছাড়া দানবাক্স থেকে ১২টি দেশের বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার, বিভিন্ন চিঠি ও চিরকুট উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে মাজারে মানত হিসেবে জমা পড়ে ৬৫টি ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদিপশু।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, অতীতে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট কোনো হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। কত টাকা জমা হচ্ছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে কিংবা কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতেই সম্প্রতি দানবাক্সগুলো সিলগালা করে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে অর্থ গণনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রায় সাত শতাব্দী ধরে পরিচালিত এই মাজারে দীর্ঘ সময় ধরে দানবাক্সের অর্থ সংগ্রহে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, সংগৃহীত অর্থ সরাসরি বিভিন্ন ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যেত এবং তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব সংরক্ষণ করা হতো না। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে প্রশ্ন ও অসন্তোষ থাকায় জেলা প্রশাসন নতুন পদ্ধতিতে দান গণনার উদ্যোগ নেয়।
মাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে রয়েছে দানবাক্সের অর্থ আত্মসাৎ, মানতের পশু ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, গিলাফ ও গোলাপজল বিক্রিতে প্রতারণা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং দর্শনার্থীদের হয়রানির মতো বিষয়। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ ফয়সাল বলেন, প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে দান গণনার পর যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া গেছে, তা থেকে দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তার দাবি, দানবাক্স সিলগালার পর কিছু অনিয়ম কমলেও দান সংগ্রহের অন্যান্য পদ্ধতিতে এখনো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমও গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, মাজারে সরাসরি হাতে হাতে দান সংগ্রহের কারণে দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ প্রকৃত সংগ্রহের তুলনায় কম হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি দর্শনার্থীদের দানবাক্সে না দিয়ে সরাসরি তাদের হাতে অর্থ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মাজারের আয় শুধু দানবাক্সের অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাজারসংলগ্ন মার্কেট, দোকানপাট, পুকুর, বিভিন্ন সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত নজরানাও আয়ের উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বিদেশ থেকে আগত অনেক ভক্ত নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা কিংবা স্বর্ণালংকার দান করে থাকেন। এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন সচেতন মহল।
মানতের পশু ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাজারে দান করা গবাদিপশু সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটে। একইভাবে গরু বা খাসি জবাই, রান্না এবং সংশ্লিষ্ট সেবার নামে নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হয়নি।
মাজারে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে পকেটমার, প্রতারণা এবং দর্শনার্থীদের হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এখনো চলমান।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মাজারের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
অন্যদিকে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, মাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধান আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত। তার মতে, পূর্ব আলোচনা ছাড়াই সিসিটিভি স্থাপন ও দানবাক্স সিলগালা করার সিদ্ধান্ত অনভিপ্রেত ছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মাজারের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে এবং পকেটমার ও প্রতারকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তারা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে পারেন না। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কমিশন গঠনের পর প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক এই স্থানে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো মানুষ জিয়ারত করতে আসেন। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, মাজারের দান ব্যবস্থাপনা, সম্পদ পরিচালনা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।


