প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নতুন নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির ১০ দিন পার হলেও এখনও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান। ফলে জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, পাশাপাশি বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলেও চলছে নানামুখী আলোচনা। নতুন ডিসির যোগদান বিলম্বিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে সরকারিভাবে কোনো ব্যাখ্যা না মিললেও বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ২৮ জুন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর তিনি কুমিল্লার দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেটে যোগদান করেননি। প্রজ্ঞাপন জারির ১০ দিন পরও তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানিয়েছেন, নতুন জেলা প্রশাসকের যোগদান কিংবা বিলম্বের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। ফলে নতুন জেলা প্রশাসক কবে যোগ দেবেন, সে প্রশ্নেরও কোনো নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানের যোগদান বিলম্বিত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও সরকারিভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি। এদিকে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে, তার নিয়োগ নিয়ে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর আপত্তি রয়েছে। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে বলে সূত্রগুলোর দাবি। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনও গুঞ্জন ও অনানুষ্ঠানিক তথ্যের পর্যায়েই রয়েছে।
সরকারদলীয় স্থানীয় রাজনৈতিক একটি সূত্র জানিয়েছে, সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে মু. রেজা হাসানের নিয়োগ একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পছন্দ হয়নি। এ কারণে নতুন করে জেলা প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি।
নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
বর্তমান পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় গত ২১ জুন, যখন সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে বদলির কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে ২৮ জুন মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তার যোগদান না করায় সেই অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
প্রশাসনিক পর্যায়ের বিভিন্ন সূত্র বলছে, সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে আলোচনায় আসেন। বিশেষ করে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
গত ১২ জুন তিনি দুই মাজার পরিদর্শন করে আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে বহু বছরের ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, দানের অর্থের সুষ্ঠু হিসাব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিকে অনেকেই প্রশাসনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে একটি অংশ এই পদক্ষেপকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা করেন।
এই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই দুই ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনার কথা বললেও সরকারিভাবে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। সরকারের একাধিক মন্ত্রী সে সময় জেলা প্রশাসকের বদলিকে প্রশাসনের নিয়মিত রদবদলের অংশ বা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ বলে উল্লেখ করেন।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন জেলা প্রশাসক যোগদান না করা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিংকি সাহা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে একজন পূর্ণাঙ্গ জেলা প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণ করলে নীতিনির্ধারণী ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও গতি আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সিলেট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। সীমান্তবর্তী এ জেলার আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন প্রকল্প, ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমে জেলা প্রশাসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে জেলা প্রশাসকের পদে অনিশ্চয়তা থাকলে প্রশাসনিক সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন জেলা প্রশাসকের যোগদান নিয়ে যেসব গুঞ্জন ও আলোচনা চলছে, তার অবসান ঘটাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। এতে জনমনে সৃষ্টি হওয়া বিভ্রান্তি দূর হবে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা কমবে।
এ মুহূর্তে সিলেটবাসীর নজর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। মু. রেজা হাসান শেষ পর্যন্ত সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, নাকি নতুন কোনো প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্য কাউকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত। সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে প্রশাসনিক অঙ্গনে চলমান এই অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।


