প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা অতি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট বন্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও বিপর্যয়ের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। জেলার কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় চার উপজেলায় প্রায় ৯৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক সেতু ও কালভার্ট। প্রাথমিক হিসেবে এসব অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্নির্মাণে প্রায় ২৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন্যার পানি অনেক এলাকায় কমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবল স্রোত বয়ে গিয়ে পিচঢালা অংশ ভেঙে নিয়েছে, কোথাও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও রাস্তার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে জেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে চরম ভোগান্তির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়দের মতে, বন্যার পানি সরে গেলেও প্রকৃত সংকট এখন শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনও চলাচল করতে পারছে না। ফলে কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে, জরুরি রোগী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দিয়ে দীর্ঘ সময় বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় রাস্তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পানির তীব্র স্রোতে অনেক স্থানে রাস্তার অংশ ধসে যায় এবং বিটুমিনের স্তর উঠে গিয়ে বড় ধরনের গর্ত সৃষ্টি হয়। এতে এসব সড়কের অনেকগুলো এখন যানবাহন চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো অনেক সড়কের ওপর পানি থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা সম্ভব হয়নি। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট পরিদর্শন করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রস্তুত করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে যে পরিমাণ ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত সড়ক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, বন্যা শুধু ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষতি করেনি, ভেঙে দিয়েছে তাদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দও। যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল না হলে পুনর্বাসন কার্যক্রম, কৃষিকাজ এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ধীরেন্দ্র দেবনাথ বলেন, ধলাই নদীর ভাঙনে আদমপুর-ইসলামপুর সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ভেঙে গেছে এবং অসংখ্য বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে সড়ক দিয়ে নিরাপদে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে বর্ষার বাকি সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও বন্যার কারণে একই ধরনের ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। কিন্তু স্থায়ী ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ না থাকায় প্রতি বছরই নতুন করে সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তারা মনে করেন, শুধু অস্থায়ী মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে নদীতীর সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং টেকসই সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বন্যা এখন প্রায় নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। শুধু তাৎক্ষণিক মেরামত নয়, ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসেবে এলজিইডির আওতাধীন প্রায় ৯৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে আনুমানিক ২৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানি থাকায় পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে চূড়ান্ত তথ্য সংগ্রহে।
তিনি আরও জানান, পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোতে জরুরি মেরামত কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যেসব সড়ক দিয়ে জরুরি যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংস্কার করা হবে। পরবর্তীতে স্থায়ী পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প ও অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজারের সাম্প্রতিক বন্যা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের বিকল্প নেই। পানি কমে যাওয়ার পর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা এখন দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো শুধু ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়, এগুলোই জেলার লাখো মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান ভরসা। তাই দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


