প্রকাশ:০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মানুষের অস্তিত্ব আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়নের নেশায় মত্ত মানবসভ্যতা যখন প্রকৃতির ভারসাম্যকে উপেক্ষা করে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখনই প্রকৃতি তার রুদ্রমূর্তি ধারণ করে আমাদের সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। আজকের এই বিশেষ দিনে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলা এবং একটি টেকসই সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নতুন করে শপথ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে, যেখানে মূল লক্ষ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য সম্মিলিত অঙ্গীকার।
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। এই প্রতিপাদ্যের গভীরতা অপরিসীম। এটি কেবল একটি শ্লোগান নয়, বরং এটি আমাদের বেঁচে থাকার নতুন দর্শনের কথা বলে। এই বার্তার মূল অর্থ হলো উন্নয়নকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা হিসেবে না দেখে, বরং প্রকৃতিকে আমাদের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার হিসেবে মেনে নেওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের যে সংকট আজ পৃথিবীকে গ্রাস করছে, তার সমাধান প্রকৃতিতেই লুকিয়ে আছে। আমাদের কেবল সেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং প্রকৃতিভিত্তিক কৌশলগুলোকে আমাদের জাতীয় নীতিমালার মূল উপজীব্য করে তুলতে হবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক মানবিক পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এই দিবসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ১৯৭৩ সাল থেকে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দিবসটি পরিবেশ রক্ষায় বিশ্ববাসীর কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও আজকের দিনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সচেতনতামূলক র্যালি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং পরিবেশবাদীদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক জরুরি প্রয়াস।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং এটি আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দাবানলের ভয়াবহ লেলিহান শিখা, কোথাওবা প্রলয়ঙ্করী বন্যা, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা কিংবা অসহনীয় তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা নিরন্তর সতর্ক করে বলছেন যে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অত্যধিক ব্যবহার এই সংকটকে প্রতিদিন আরও গভীর করছে। প্রকৃতির ওপর মানুষের এই অযৌক্তিক হস্তক্ষেপই আজ বিশ্বকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় আমাদের নাম একেবারে প্রথম সারিতে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা কৃষি জমিকে অনুর্বর করে তুলছে। জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, অসময়ে বৃষ্টিপাত এবং তীব্র তাপপ্রবাহ আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নগরাঞ্চলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশুদ্ধ বায়ু ও পানি পাওয়া আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন, যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম, বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে। তাদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আজ সংশ্লিষ্ট সকল মহল পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা এমন হতে হবে যা পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতির ক্ষতি করবে না। বনভূমি সৃজন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকতে হবে দূরদর্শী চিন্তা এবং প্রকৃতির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ।
প্রকৃতি আমাদের সবটুকু দিয়ে আগলে রেখেছে। আমরা যদি আজ সচেতন না হই, তবে আগামী দিনে প্রকৃতি আমাদের ক্ষমা করবে না। বৃক্ষরোপণ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি জীবনের সঞ্চার। জলাভূমি রক্ষা করা শুধু একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আমাদের পানির উৎস বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। আসুন, আজকের এই দিনে আমরা অঙ্গীকার করি, আমরা কেবল প্রকৃতির ভোক্তা হবো না, বরং আমরা প্রকৃতির রক্ষক হবো। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই আমরা তৈরি করব এমন এক পৃথিবী, যেখানে জলবায়ু সংকটের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে আমাদের সম্মিলিত মানুষের জয়গান। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, শীতল ও নির্মল পৃথিবী রেখে যাওয়াই হোক আমাদের আজকের দিনের মূল প্রতিজ্ঞা। পরিবেশ বাঁচলে তবেই বাঁচবে বাংলাদেশ, বাঁচবে পৃথিবী।


