জাফলংয়ে চালু হলো খাসিয়া হোমস্টে পর্যটন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটের জাফলং মানেই পাহাড়, ঝরনা আর স্বচ্ছ পাথুরে নদীর অপার্থিব সৌন্দর্য। বছরের প্রায় সব সময়ই প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এ অঞ্চল। সাধারণত পর্যটকেরা জাফলং জিরো পয়েন্ট ঘুরে ছবি তুলে ফিরে যান। কিন্তু পাহাড়ঘেরা এই জনপদের আরেকটি অনন্য জগৎ দীর্ঘদিন ধরেই অনেকের অজানা ছিল। পিয়াইন নদ পার হলেই দেখা মেলে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসতি, যাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তা এখন নতুনভাবে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে “কমিউনিটি ট্যুরিজম” উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর যৌথ উদ্যোগে গত বছরের জুলাই থেকে জাফলংয়ের কয়েকটি খাসিয়া পুঞ্জিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এই বিশেষ পর্যটন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে পর্যটকেরা শুধু ঘুরতে নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে থেকে তাঁদের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারা ও ঐতিহ্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমানে তিনটি খাসিয়া পুঞ্জিতে চারটি হোমস্টে চালু রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ১৫ জন পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাটে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে পিয়াইন নদীর নীলাভ স্বচ্ছতা। নদীর ওপারে সবুজ পাহাড়ের সারি যেন অন্য এক পৃথিবীর আহ্বান জানায়। পর্যটকদের স্বাগত জানান স্থানীয় খাসিয়া তরুণ-তরুণীরা, যারা এখন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করছেন। কেউ কলেজে পড়ছেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হওয়ার পর শুরু হয় অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। ঘাটের ওপারেই খাসিয়া কমিউনিটি মিশন। স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট্ট কিন্তু পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এখানেই চালু হয়েছে দুটি হোমস্টে কক্ষ। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে রয়েছে পরিপাটি বিছানা, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা। পর্যটকদের জন্য বাড়ির সদস্যদের মতো আন্তরিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেন আয়োজকেরা।

আরও ভেতরে এগোলে দেখা মেলে নকশিয়াপুঞ্জি ও লামাপুঞ্জির। খাসিয়া সম্প্রদায়ের ভাষায় একটি পাড়া বা মহল্লাকে বলা হয় “পুঞ্জি”। এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জিতে যেতে যেতে চোখে পড়ে সারি সারি সুপারি গাছ, সবুজ পানবরজ আর পাহাড়ি পথ। পুরো এলাকাজুড়ে এক ধরনের প্রশান্তি বিরাজ করে। পুঞ্জির বাড়িগুলোও আলাদা বৈশিষ্ট্যের। বেশির ভাগ ঘরই মাটি থেকে কিছুটা উঁচু করে মাচার ওপর নির্মিত। কোথাও বাঁশের তৈরি ঘর, কোথাও আধাপাকা কিংবা পাকা বাড়ি। প্রতিটি উঠান ও ঘর অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।

স্থানীয় গাইড সেভেনলী খংস্তিয়া জানান, খাসিয়ারা বরাবরই পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। অতীতে বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে তাঁরা মাচার ওপর ঘর তৈরি করতেন। সময় বদলেছে, কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন তাঁরা। এটাই তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

নকশিয়াপুঞ্জির হেডম্যান ওয়েলকাম লাম্বা বলেন, শুরুতে কমিউনিটি ট্যুরিজম নিয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। বাইরের মানুষ এসে তাঁদের ঘরে থাকবে—এ ধারণা সহজভাবে নিতে পারেননি অনেকে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পর্যটকেরা আসায় তাঁদের বাড়তি আয় হচ্ছে, পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতিও পরিচিত হচ্ছে। খুব বেশি খরচ ছাড়াই বাড়ির অব্যবহৃত কক্ষগুলো সংস্কার করে হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। শৌচাগার ও অন্যান্য সুবিধাও উন্নত করা হয়েছে।

পর্যটকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে স্থানীয়ভাবেই। “রমলা রেস্টুরেন্ট” নামে একটি কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে দেশীয় খাবারের পাশাপাশি পরিবেশন করা হয় খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পদ। বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে বা চিকেন সালাদ, বাঁশকোঁড়লের তরকারি, কাঁঠাল-শুঁটকির বিশেষ রান্না, সরওয়া স্যুপ কিংবা দেশি মসলায় রান্না করা চিকেন ভুনা—এসব খাবার পর্যটকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এখানকার রান্নায় পাহাড়ি স্বাদ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মিশ্রণ পাওয়া যায়। খাবারের মূল্যও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।

দিনের বেলায় পর্যটকেরা ঘুরে দেখতে পারেন জাফলং চা-বাগান, যা সিলেট অঞ্চলের বৃহত্তম সমতল চা-বাগানগুলোর একটি। রয়েছে সাইকেল ট্র্যাকিং এলাকা এবং ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে তৈরি সেলফি জোন। বিকেলের দিকে পাহাড়ি আলো-আঁধারিতে পুরো পুঞ্জি যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর খাসিয়া শিশু-কিশোরেরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নিজেদের ভাষার গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে। পর্যটকেরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন সেই সাংস্কৃতিক আয়োজন।

রাতের আরেকটি আকর্ষণ কমিউনিটি মিউজিয়াম। এখানে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পুরোনো পোশাক, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, প্রাচীন অস্ত্রের আদলে তৈরি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ এবং নানা ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটকেরা এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অতীত ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পান।

পরদিন সকালে খাসিয়া পানচাষিদের কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। পানপাতা খাসিয়াদের কাছে শুধু অর্থনৈতিক ফসল নয়, এটি সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, পবিত্রতা বজায় রেখেই পান সংগ্রহ করতে হয়। তাই ভোরে গোসল করে পানবরজে প্রবেশ করেন চাষিরা। পানবরজের ভেতরেই রয়েছে সুপারি ও দেশি কমলার গাছ। মূলত পান ও সুপারি চাষই তাঁদের প্রধান জীবিকা। তবে এখন পর্যটনও ধীরে ধীরে নতুন আয়ের পথ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত নিয়ে ধাপে ধাপে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে পর্যটন কার্যক্রম তাঁদের সংস্কৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি না করে বরং ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি পরিবার হোমস্টে চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অটোরিকশাচালক, দোকানি, নৌকার মাঝি, ট্যুর গাইড—সবার আয় বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পর্যটকেরা সরাসরি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়ায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠছে আরও মানবিক ও স্মরণীয়।

তবে আপাতত এই রাতযাপনের সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। আগ্রহী পর্যটকদের আগে থেকেই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হয়। কারণ কর্তৃপক্ষ চায় সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিতভাবে এই পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করতে, যাতে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য, পাহাড়ি সংস্কৃতি আর আন্তরিক আতিথেয়তার মিশেলে জাফলংয়ের খাসিয়া পুঞ্জির এই নতুন পর্যটন উদ্যোগ ইতোমধ্যে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। শুধু বেড়ানো নয়, মানুষ ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার এই অভিজ্ঞতা হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ব্রুনাইয়ে ৮৮ নির্মাণ শ্রমিক নেবে সরকার

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের হাওরে বৃষ্টির পর গরুর খাদ্য সংকটে কৃষক

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে সীমান্তপথে আনা ৬ গরু জব্দ

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় ২ কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় সিএনজির ধাক্কায় আইসিইউতে বিদ্যুৎ কর্মী

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ব্রুনাইয়ে ৮৮ নির্মাণ শ্রমিক নেবে সরকার

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের হাওরে বৃষ্টির পর গরুর খাদ্য সংকটে কৃষক

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুনারুঘাটে সীমান্তপথে আনা ৬ গরু জব্দ

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় ২ কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় সিএনজির ধাক্কায় আইসিইউতে বিদ্যুৎ কর্মী

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিজ্ঞান মেলা ও ক্রীড়া আয়োজনে সিলেটে বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে অ্যাসিড সন্ত্রাসে ঝলসে গেল মা ও শিশু

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঢাকা উত্তরে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন সেলিম উদ্দিন

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ