প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পরিবেশ রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়াতে সিলেটে নেওয়া হচ্ছে ব্যতিক্রমধর্মী এক গণউদ্যোগ। একদিনেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১০ লাখ গাছ রোপণ এবং অন্তত ৫০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো কর্মসূচির সময়সূচি ও স্থান নির্ধারণ করা হবে। এরপর নির্ধারিত এলাকায় একযোগে শুরু হবে এই বৃহৎ জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম।
রোববার সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এ তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। সভায় সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, সিলেটের পরিবেশ, কৃষি ও জলব্যবস্থাপনা রক্ষায় এই কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কোথায় খাল খনন হবে, কোথায় পুনঃখনন প্রয়োজন এবং কোন এলাকায় বৃক্ষরোপণ করা হবে—এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে।
মো. সারওয়ার আলম বলেন, “আমরা চাই এটি শুধু প্রশাসনিক কর্মসূচি না হয়ে মানুষের অংশগ্রহণে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হোক। নির্ধারিত দিনে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলে এটি সিলেটের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকার গত ১৬ মার্চ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো, বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং মৃতপ্রায় জলাশয়গুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দখল এবং পলি জমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক খাল ও জলপথ নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে পানির সংকট।
সিলেট অঞ্চলেও একই ধরনের সমস্যার প্রভাব স্পষ্ট। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রায়ই হঠাৎ বন্যা দেখা দেয়। অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, জনজীবন ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খাল পুনঃখনন ও জলাধার পুনরুদ্ধার করা গেলে এসব সমস্যার অনেকটাই কমে আসবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় শুধু বড় খাল নয়, স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছোট ছোট জলপথও চিহ্নিত করা হবে। যেসব খাল দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় ভরাট হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মাটি ক্ষয় রোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সভায় জানানো হয়, সিলেটের প্রতিটি উপজেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কমিটি গঠনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে বৃহৎ পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গত ২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেটে বাসিয়া নদী পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই সিলেটে পরিবেশ ও জলব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকারের সক্রিয়তা আরও জোরদার হয়েছে বলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তিনি সিলেটবাসীর প্রতি এই কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এত বড় উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, গাছগুলোর পরিচর্যা ও সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় বড় আকারে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে পরিচর্যার অভাবে চারা নষ্ট হয়ে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একইভাবে খাল খননের পর তা দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও নজরদারি বাড়ানো গেলে খাল ও জলাশয়গুলো দীর্ঘসময় কার্যকর রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ মানুষও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। অনেকেই মনে করছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য অঞ্চল গড়ে তুলতে এমন কর্মসূচি অত্যন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ এবং জলাধার সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
সিলেটের পাহাড়, হাওর, নদী ও সবুজ প্রকৃতি এই অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জলপথ দখলের কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের এই বৃহৎ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণেই নয়, সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এখন সিলেটবাসীর দৃষ্টি আগামী ঘোষণার দিকে। কবে, কোথায় এবং কীভাবে এই বৃহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে—তা জানতে আগ্রহ বাড়ছে মানুষের মধ্যে। অনেকেই আশা করছেন, প্রশাসনের এই উদ্যোগ একদিনের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ আন্দোলনের রূপ নেবে।


