প্রকাশ:০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ভূমি কার্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং কার্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর করার অভিযোগে দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ভূমি কার্যালয়ের কর্মপরিবেশ ও সরকারি দায়িত্ব পালনে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সোমবার সকালে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আকস্মিক পরিদর্শনের সময় বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিমন্ত্রী নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে নারায়ণগঞ্জের খানপুর এলাকায় অবস্থিত সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে পৌঁছে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পান। পরে হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে কয়েকজনের নামে আগেই উপস্থিতির স্বাক্ষর করা রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো উপস্থিত থাকা এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জনসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে ভূমি কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জমি, নামজারি, খতিয়ান, রেকর্ড সংশোধন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা নিতে আসেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতির কারণে এসব সেবা ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত জাকিয়া সরওয়ার লিমা জানিয়েছেন, সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের ছয়জন এবং ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের দুজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় এবং ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি)কেও পৃথকভাবে শোকজ করা হয়েছে।
নোটিশে সরকারি দপ্তরে নিয়মিত উপস্থিতির বিধান মেনে চলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। আবার ৩১ আগস্টের হাজিরা খাতায় কয়েকজনের স্বাক্ষর আগে থেকেই দেওয়া ছিল বলে পরিদর্শনের সময় প্রতীয়মান হয়।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীর অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার ঘটনা সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮ এবং সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর লঙ্ঘনের আওতায় পড়তে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নোটিশ পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
শোকজ পাওয়া দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি) হলেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার এবং ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংমাচিং মারমা। তাদের দায়িত্বাধীন কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রশাসনের তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
সোমবার সকাল ৯টার কয়েক মিনিট আগে প্রতিমন্ত্রী খানপুর এলাকায় সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে যান। একই চত্বরে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেল এবং সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের কার্যালয়ও অবস্থিত।
প্রতিমন্ত্রী সেখানে পৌঁছে বিভিন্ন দপ্তরের উপস্থিতি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং হাজিরা খাতা পরীক্ষা করেন। এ সময় কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে হাজিরা খাতায় তাদের স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি সামনে এলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার খবর পাওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রিনাত ফৌজিয়া কার্যালয়ে উপস্থিত হন। পরে ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংমাচিং মারমাও সেখানে উপস্থিত হন।
পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে কারা নিয়ম ভঙ্গ করেছেন এবং কারা প্রকৃতপক্ষে দায়ী, তা নির্ধারণ করা হবে।
শোকজ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের কানুনগো আব্দুস সাত্তার, সার্ভেয়ার মো. আসাদুজ্জামান, নাজির কাম ক্যাশিয়ার মাসুম মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজা আক্তার, সার্টিফিকেট সহকারী সাদিয়া আক্তার এবং চেইনম্যান মীর মোজাম্মেল হক রয়েছেন। এছাড়া অফিস সহায়ক আব্দুস সালাম, ইউনূস আলী, মোক্তার হোসেন এবং গাড়িচালক নাদিম হায়দারকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেল থেকে কানুনগো ফারুক আলম, সার্ভেয়ার জামাল উদ্দিন, মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী জান্নাত হোসেন, নাজির কাজী তানজিরুল হক, অফিস সহায়ক মোকলেছ শেখ এবং চেইনম্যান রফিকুল ইসলাম শোকজের আওতায় রয়েছেন।
এ ছাড়া ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সার্ভেয়ার মিল্টন রায় এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক সাহাদাতকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশাসন বলছে, শোকজ করা মানেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। কারণ দর্শানোর নোটিশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা নেওয়া হবে। এরপর তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং তাদের লিখিত জবাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানিয়েছেন, ভূমি কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি বলেন, সবাই হয়তো একই ধরনের অনিয়ম করেননি। কারও বিরুদ্ধে আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগ থাকতে পারে, আবার কারও অনুপস্থিতির পেছনে গ্রহণযোগ্য কারণও থাকতে পারে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী বলা সম্ভব নয়।
সরকারি অফিসে সময়মতো উপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক নিয়মের বিষয় নয়, এটি সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গেও জড়িত। ভূমি অফিসে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জরুরি কাজ নিয়ে আসেন। অনেককে নামজারি, জমির কাগজপত্র, রেকর্ড সংশোধন কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এসব মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনার পর সরকারি দপ্তরগুলোতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর লিখিত ব্যাখ্যা এবং প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলের দিকেই নজর থাকবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থানও বিবেচনা করা হবে।
অতএব, আকস্মিক পরিদর্শনে উঠে আসা এই ঘটনা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারি দপ্তরে জবাবদিহি, সময়ানুবর্তিতা এবং জনসেবার মান নিশ্চিত করার প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশাসনের তদন্ত শেষ হলে এ ঘটনায় কার দায় কতটুকু এবং কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।


