প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গুমের অভিযোগ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করার পাশাপাশি প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়। দলটির বক্তব্য, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তদন্ত করানো যাবে না, যাদের কোনো সদস্য বা সংস্থার বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এনসিপি বলছে, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ছাড়া গুমসংক্রান্ত নতুন আইন বাস্তবে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে পারবে না। বরং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই যদি তদন্তের নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন।
দলটির মতে, গুমের প্রতিটি অভিযোগ পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রস্তাবিত আইনে তালিকাভুক্ত অন্যান্য বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, তা ফিরিয়ে আনারও দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
অন্যথায় সরকার এমন একটি নতুন স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করতে পারে বলেও প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। সেই সংস্থার হাতে পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতা থাকতে হবে বলে জানিয়েছে এনসিপি।
দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, গুমসংক্রান্ত অধ্যাদেশ গত এপ্রিল মাসে বিলুপ্ত হওয়ায় নতুন করে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশে গুমের একটি কার্যকর আইনি সংজ্ঞা নিয়ে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তাই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য একটি আইন থাকা জরুরি। তবে যে খসড়া আইন সামনে এসেছে, সেটি যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে মনে করছে এনসিপি।
খসড়া আইনের ১৪ ধারাকে বিশেষভাবে সমস্যাজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে দলটি। এনসিপির দাবি, এই ধারায় কেউ গুমের অভিযোগ করতে চাইলে তাকে থানায় যেতে হবে এবং এরপর সেই অভিযোগ তদন্ত করবে পুলিশ। অথচ প্রস্তাবিত আইনেই পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং সরকারের গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যদের গুমের ঘটনায় জড়িত হওয়ার সম্ভাব্য পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ অবস্থায় অভিযোগ গ্রহণের পর তদন্তের দায়িত্ব যদি আবার পুলিশের কাছেই থাকে, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে এনসিপি। বিশেষ করে কোনো পুলিশ সদস্য বা পুলিশের কোনো ইউনিটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে একই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের দিয়ে তদন্ত করানো হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এনসিপি বলেছে, গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়; অতীত অভিজ্ঞতাও এর গুরুত্ব তুলে ধরে। দলটির দাবি, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন দেড় হাজারের বেশি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টিরও কম ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা সম্ভব হয়েছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে অস্বীকৃতির ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছে দলটি।
খসড়া আইনে পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু এনসিপির মতে, এতে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ নথিভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তদন্তের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছেই ফিরে গেলে তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
দলটির আরও যুক্তি, গুমের মতো ঘটনায় একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে ক্ষমতাবান কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত পরিচালনা করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। কোনো ঘটনায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, সামরিক কর্মকর্তা বা আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সম্ভাব্য আটকস্থলে প্রবেশের মতো বিষয়গুলোতে একজন তদন্ত কর্মকর্তার বাস্তব ক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এনসিপি মনে করে, কাগজে তদন্তের ক্ষমতা থাকলেই বাস্তবে কোনো তদন্ত কর্মকর্তা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। ফলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা না করলে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে অথবা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে বাধা তৈরি হতে পারে।
দলটির মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য আলামত, সরকারি নথি, নজরদারি সংক্রান্ত তথ্য কিংবা আটক ও হেফাজতের রেকর্ড সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেই থাকতে পারে। স্বাধীন তদন্ত সংস্থা না থাকলে এসব আলামত নিরপেক্ষভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছে দলটি।
এনসিপি খসড়া আইনের ২১ ধারার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, বিচার শেষে কোনো গুমের অভিযোগ মিথ্যা এবং হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলে প্রমাণিত হলে আদালত অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারবেন।
দলটির বক্তব্য, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্তব্যবস্থা অবশ্যই স্বাধীন হতে হবে। তা না হলে একজন ভুক্তভোগী পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ করার পর পুলিশই সেই অভিযোগ তদন্ত করবে এবং পরে অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পরিবারকে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এমন পরিস্থিতি প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগ করার ক্ষেত্রে ভয় তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে এনসিপি। গুমের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় পরিবারগুলো এমনিতেই দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ ও সামাজিক উদ্বেগের মধ্যে থাকে। অভিযোগ করার পর উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা থাকলে অনেক পরিবার হয়তো ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
এনসিপি আরও বলেছে, গুমের অভিযোগ তদন্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেয়। দলটির বক্তব্য, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দিয়েছে। ওই সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
দলটির দাবি, জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও বিভিন্ন সময়ে তদন্তের নিরপেক্ষতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করা উচিত নয়—এমন অবস্থানের কথাও এনসিপি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে।
এ কারণে প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইনের ১৪ ধারা আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করছে না বলে দাবি করেছে দলটি। তাদের মতে, গুম প্রতিরোধের জন্য শুধু আইন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; আইনটি এমন হতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারেন।
গুমের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতি ও মানবাধিকার আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। কোনো ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার পর তার অবস্থান, আটক বা মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে এ ধরনের অভিযোগের তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনসিপির চার দফা দাবির মূল লক্ষ্য হিসেবে তাই স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই সামনে এসেছে। দলটি মনে করছে, পুলিশ বা কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীর বাইরে থাকা একটি ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত সংস্থা তদন্ত পরিচালনা করলে অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী পরিবারের আস্থা বাড়তে পারে।
তবে খসড়া আইন নিয়ে সরকারের পরবর্তী অবস্থান কী হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপির উত্থাপিত দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইনটি সংশোধন করা হবে কি না এবং গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সামনে আরও আলোচনা হতে পারে।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের অধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন যেন না থাকে, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
এনসিপির দাবি, শক্তিশালী ও স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ছাড়া গুমের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই প্রস্তাবিত আইন চূড়ান্ত করার আগে স্বাধীন তদন্ত সংস্থার কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

