প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলায় একটি বিজিবি ক্যাম্পের ওয়াচ টাওয়ার থেকে জামিল হাসান শিষ (২৫) নামে এক বিজিবি সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে কী কারণে এই বিজিবি সদস্যের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিহত জামিল হাসান শিষ বিজিবির একজন সিপাহী ছিলেন। তার সিপাহী নম্বর ১১৪১০১। তিনি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের ইশানঘাটি গ্রামের বাসিন্দা শেখ ফজলুর রহমানের ছেলে। কর্মসূত্রে তিনি সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অধীনে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জানা গেছে, গত ২২ আগস্ট থেকে জামিল হাসান শিষ জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী মিনাটিলা বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি ওই ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর তার এমন মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোরের মধ্যে কোনো একসময় মিনাটিলা বিওপির ওয়াচ টাওয়ারে ওই বিজিবি সদস্যের মৃত্যু ঘটে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে পুলিশ বলছে, তার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর সঠিক সময় এবং ঘটনার পেছনের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হলে জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
এ সময় জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মনিরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হালিমও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পরে প্রশাসন ও বিজিবি কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলের প্রাথমিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে ঘটনাটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।
সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী একজন তরুণ বিজিবি সদস্যের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। জামিল হাসান শিষের মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, মানসিক নাকি কর্মক্ষেত্রসংক্রান্ত কোনো বিষয় কাজ করেছে, তা এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন, পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং সীমান্তের মতো সংবেদনশীল এলাকায় কঠোর দায়িত্ব পালনের বাস্তবতা অনেক সময় ব্যক্তিগত জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে জামিল হাসানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিষয় ছিল কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তারা গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচার না করার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জামিল হাসান শিষের পরিবার নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থান করছে। পরিবারের সদস্যদের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর স্বজনদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। পরিবারের একজন তরুণ সদস্যের এমন আকস্মিক মৃত্যু স্বজনদের জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি সদস্যরা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেন। সেই দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় একজন সদস্যের অস্বাভাবিক মৃত্যু শুধু তার পরিবার নয়, সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জন্যও একটি বেদনাদায়ক ঘটনা।
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পক্ষ থেকে তদন্ত বা অভ্যন্তরীণ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
তবে যেহেতু ঘটনাটি একটি সীমান্তবর্তী বিওপিতে ঘটেছে, তাই পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
জৈন্তাপুরের মিনাটিলা বিওপিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা করা হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। পুলিশ বলছে, সব দিক বিবেচনায় রেখেই ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
একজন তরুণ বিজিবি সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার এখন উত্তর খুঁজছে, সহকর্মীরা শোকাহত এবং স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। তদন্তের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত জানাবে, ঠিক কী ঘটেছিল মিনাটিলা বিওপির সেই ওয়াচ টাওয়ারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ ঘটনায় নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানা সম্ভব হবে।


