প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতিটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হার, ব্যাটিংয়ে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে লড়াইয়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের সামনে ছিল বড় পরীক্ষা। কিন্তু ক্রিকেট যে অনিশ্চয়তার খেলা, ডারউইনে সিরিজের প্রথম দিনেই সেটি আবারও প্রমাণ করল বাংলাদেশ।
মারারা স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। উইকেটে আর্দ্রতা থাকলেও বাংলাদেশের পেসাররা সেই সুবিধাকে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করেন। শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে স্বাগতিক ব্যাটারদের চাপে রাখেন তারা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সামনে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস।
জবাবে দিনের শেষভাগে ব্যাট হাতে দারুণ সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশও। প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় ১ উইকেটে ৯৬ রান সংগ্রহ করেছে সফরকারীরা। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে এখনো ১০২ রানে পিছিয়ে থাকলেও হাতে রয়েছে ৯ উইকেট। ক্রিজে অপরাজিত রয়েছেন মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসান। মুমিনুলের সংগ্রহ ৩৫ এবং তানজিদের ৩২ রান।
তবে ডারউইনের প্রথম দিনের মূল নায়ক একজনই—হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে তিনি ৫৫ রানে তুলে নিয়েছেন ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটাই এখন পর্যন্ত সেরা বোলিং। তার দুর্দান্ত স্পেলের সামনে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ বারবার ভেঙে পড়েছে।
দিনের প্রথম ঘণ্টা শেষ হওয়ার দিকে হাসান মাহমুদের হাতে আসে প্রথম সাফল্য। ৪৫ রানের উদ্বোধনী জুটি ভেঙে জ্যাক ওয়েদারাল্ডকে ২৩ রানে ফেরান তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে তখনও বড় কোনো বিপদের আভাস ছিল না। কিন্তু পরের ওভারেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন হাসান।
ট্রাভিস হেডকে মাত্র ২২ রানে বোল্ড করে দেন এই ডানহাতি পেসার। পরপর দুই উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ওপর চাপ তৈরি করেন তিনি। এরপর সেই চাপে আরও গতি যোগ করেন এবাদত হোসেন চৌধুরী ও তাসকিন আহমেদ।
ইবাদতের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন মার্নাস লাবুশেন। এরপর লাঞ্চের ঠিক আগের বলে বাউন্ডারি হাঁকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন ক্যামেরন গ্রিন। লাঞ্চের বিরতিতে যাওয়ার সময় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৭৪ রান।
বাংলাদেশের পেসারদের জন্য সেশনটি আরও বড় সাফল্যে পরিণত হতে পারত। ব্যক্তিগত ২ রানে ইবাদতের বলে স্টিভেন স্মিথ তৃতীয় স্লিপে ক্যাচ দিয়েছিলেন। কিন্তু তানজিদ হাসান সেই সহজ সুযোগটি তালুবন্দী করতে পারেননি। জীবন ফিরে পাওয়া স্মিথ এরপর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
অ্যালেক্স ক্যারিকে সঙ্গে নিয়ে স্মিথ গড়েন ৫৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। এক প্রান্তে নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা স্থিরতা এনে দেন তিনি। তবে দ্বিতীয় সেশনের পানি বিরতির পরপরই সেই জুটি ভেঙে দেন এবাদত। বিরতির পর প্রথম বলেই অ্যালেক্স ক্যারিকে ১৯ রানে বোল্ড করে দেন তিনি।
এরপর বোলিং আক্রমণে আরও একবার সফল হন তাসকিন আহমেদ। অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে আসা দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার বাউ ওয়েবস্টার। একের পর এক উইকেট পড়লেও অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন স্মিথ।
দুই রানে জীবন পাওয়া স্মিথ শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন। তার ব্যাটেই স্বাগতিকরা দুইশ রানের কাছাকাছি যেতে পেরেছিল। কিন্তু হাসান মাহমুদের নতুন স্পেল অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধটুকুও ভেঙে দেয়।
পরপর দুই ওভারে প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে দেন হাসান। ফলে ৮ উইকেটে ১৮২ রান নিয়ে চা বিরতিতে যায় অস্ট্রেলিয়া। শেষ সেশনে পাঁচ ওভারও টিকতে পারেনি স্বাগতিকদের ইনিংস।
হাসানের শর্ট বলে বড় শট খেলার চেষ্টা করেন স্মিথ। কিন্তু বল আকাশে তুলে দিয়ে ক্যাচে পরিণত হন তিনি। ৭১ রানে থামে তার লড়াকু ইনিংস। এরপর নাথান লায়নকেও ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেন হাসান মাহমুদ।
টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি হাসানের তৃতীয় পাঁচ উইকেট শিকার। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাকিস্তানের মাটিতে এবং ভারতের বিপক্ষে ভারতের মাটিতে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণকে নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদ ৬টি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের পেসাররা প্রতিপক্ষের সবকটি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখালেন। এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষেও বাংলাদেশের পেসাররা প্রতিপক্ষের ১০টি উইকেট নিয়েছিলেন।
ডারউইনে ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে নিজেদের সর্বনিম্ন স্কোরও গড়েছে অস্ট্রেলিয়া। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ২১৭ রানে অলআউট হয়েছিল তারা। এবার নিজেদের কন্ডিশনেই আরও কম রানে গুটিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস।
অস্ট্রেলিয়াকে দ্রুত অলআউট করার পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েও শুরুটা ছিল ইতিবাচক। যদিও ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জীবন পান তানজিদ হাসান তামিম। মিচেল স্টার্কের বলে লিডিং এজ হয়ে কাভার অঞ্চলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন তিনি। বলের নিচে দীর্ঘক্ষণ থাকার পরও সেটি তালুবন্দী করতে পারেননি নাথান লায়ন। ফলে রানের খাতা খোলার আগেই জীবন ফিরে পান তানজিদ।
জীবন পাওয়ার পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি। দুই ওপেনার তানজিদ ও সাদমান ইসলাম শুরুতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করার চেষ্টা করেন। তবে নবম ওভারেই সেই জুটি ভেঙে দেন মিচেল স্টার্ক।
লেগ স্টাম্পের বল আগেভাগে খেলতে গিয়ে লিডিং এজ হয় সাদমানের ব্যাটে। কাভার-পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তিনি। ২০ রানে থামে সাদমানের ইনিংস। অস্ট্রেলিয়া তখন বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করার সুযোগ পেলেও সেটি কাজে লাগাতে পারেনি।
এরপর তানজিদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে জুটি গড়েন মুমিনুল হক। নিজের স্বভাবসুলভ নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে দলের রান এগিয়ে নিতে থাকেন মুমিনুল। অন্য প্রান্তে তানজিদও সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্মক শট খেলেছেন এবং স্কোরবোর্ড সচল রেখেছেন।
দিনের শেষদিকে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর কোনো বিপদ ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত ৪৯ বলে ৩৫ রান করে অপরাজিত থাকেন মুমিনুল হক। তানজিদ হাসানের সংগ্রহ ৬৭ বলে ৩২ রান। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন জুটি ইতোমধ্যে ৬০ রান যোগ করেছে।
দিনের শুরুতে যে বাংলাদেশকে নিয়ে আশঙ্কা ছিল, দিনের শেষভাগে সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াইয়ের অবস্থানে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রস্তুতি ম্যাচের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর প্রথম টেস্টের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের পেসাররা দেখিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়াই করা সম্ভব।
বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট বাংলাদেশের জন্য বড় প্রেরণা। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে ১৯৮ রানে থামানোর পর ব্যাটাররাও যদি দ্বিতীয় দিনে এই ভিত্তিকে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তভাবে বাংলাদেশের হাতে আসতে পারে।
তবে টেস্টের এখনও অনেকটা পথ বাকি। ডারউইনের উইকেট ও কন্ডিশন বদলাতে পারে, অস্ট্রেলিয়াও দ্বিতীয় দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। তাই প্রথম দিনের সাফল্যকে ধরে রেখে বাংলাদেশের ব্যাটারদের দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থাকতে হবে। মুমিনুল ও তানজিদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো দিনের শেষভাগে গড়া জুটিকে বড় রানে রূপ দেওয়া।
প্রথম দিনের শেষে অবশ্য বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে স্বস্তির আবহ থাকারই কথা। যে দলকে নিয়ে সিরিজ শুরুর আগে আশাবাদী হওয়ার মানুষ কম ছিল, সেই দলই ডারউইনে প্রথম দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে ফেলেছে। এখন সেই স্বপ্নময় প্রথম দিনকে বড় সাফল্যের গল্পে পরিণত করার পালা বাংলাদেশের।


